বাংলাদেশের অদ্ভুত এবং চমৎকার প্রাণীকুল

Share

বাংলাদেশ হলো চমৎকার (এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অদ্ভুত), আকর্ষণীয় প্রাণীর এক বিচিত্র আবাসস্থল। এখানে দশটি চমৎকার প্রাণীর বর্ণনা দেয়া হলো:

১. বাঘ

রয়েল বেঙ্গল টাইগার হলো বাংলাদেশের প্রতীক, যদিও এটি এখন বিপন্নপ্রায়। সুন্দরবন হলো বাঘের আবাসস্থল। এর সোনালী আর কালো রঙের ডোরাকাটা দাগ একে বনের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করে। পুরুষের ওজন সর্বোচ্চ ১৮০ কেজি এবং দৈর্ঘ্য ৩ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। বাঘের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাইবেরিয়ান বাঘের ওজন হলো ৩০০ কেজি আর দৈর্ঘ্য ৪ মিটার।

২. হরিণ

বাংলাদেশে নানা প্রজাতির হরিণ বাস করে।
সবচেয়ে পরিচিত হরিণ হলো সাম্বা হরিণ এবং এরা বড় প্রজাতির হরিণের মধ্যে অন্যতম। সমগ্র এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এদের বাস। পুরুষ হরিণ কাঁধের দিকে প্রায় ১৩৫-১৫০ সে.মি. লম্বা হয় এবং ওজন হয় প্রায় ৩০০ কেজি পর্যন্ত। এরা প্রায় ২০ বছর বাঁচে এবং এরা হলো পূর্বে উল্লিখিত বাঘের শিকারের বস্তু, যা খেয়ে বাঘ প্রায় ৪ দিন বাঁচতে পারে। আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সচেতন থাকার এবং সতর্কবার্তা দেয়ার জন্য এদের ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। এরা পূর্ব এবং উত্তরপূর্ব পাহাড়ি অঞ্চলে বাস করে।
সাম্বা হরিণ থেকে চিত্রল (বা বর্ণীল) হরিণের পার্থক্য হলো শিকারি প্রাণী দেখলে চিত্রল হরিণ জোরে সতর্কবার্তা প্রদান করে এবং দৌড়ে পালিয়ে যায়। ঝোপঝাড়ের মধ্যে এরা সর্বোচ্চ ৩ টি পুরুষ হরিণের নেতৃত্বে ৩০ টি হরিণ পর্যন্ত দলবদ্ধভাবে পরিভ্রমণ করে থাকে। এদের শাবকগুলো খুবই সুন্দর আর বর্ণীল হয়ে থাকে এবং এগুলো সাধারণত সুন্দরবনে বাস করে। এদের উচ্চতা সর্বোচ্চ ৯০ সে. মি. এবং ওজন ৮৫ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
আসন্ন শিকারিদের নিকট থেকে দলকে সতর্ক করার জন্য বার্কিং ডিয়ার (ঘেউ ঘেউ করা হরিণ) ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের মতো শব্দ করে। বাংলাদেশ প্রাপ্ত হরিণের মধ্যে এরাই সবচেয়ে ছোট প্রজাতির, এবং প্রজননের সময় এদের ছোট ছোট শিং এবং দাঁত গজায়।

৩. উল্লুক এবং বানর

যদিও এই প্রাইমেটগুলো সুন্দরবনেই সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়, তবে সারা বাংলাদেশেই এরা বাস করে।
হুলক প্রজাতির উল্লুক গান গাওয়ার জন্য পরিচিত এবং তারা তাদের বাসস্থান রক্ষা করার জন্য গান গেয়ে থাকে, যার মাধ্যমে অন্যরা এদের উপস্থিতি বুঝে নেয়। এরা সারা জীবনের জন্য জীবনসঙ্গী নির্বাচন করে থাকে।
আমাদের বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির তালিকার মধ্যে আরেকটি হলো স্লো লরিস, যদিও এরা প্রায় বিপন্ন। এরা একা বাস করে এবং রাতের বেলা বের হয়ে এরা পাতা, ফলমূল এবং পোকামাকড় খায়। এরা দেশের উত্তরপূর্ব এবং দক্ষিণপূর্ব বনাঞ্চলে বাস করে।
রিউসাস মেকাকু সরবোচ্চ ৭৮ টি প্রাইমেটের দলে বাস করে। এরাও পকামাক্কর, ফলমূল এবং গাছের পাতা খায় এবং এদেরকে মনুষ্য বসতি ও বন উভয় জায়গাই পাওয়া যায়।
পিগ-টেইল্ড মেকাকুর এমন নামকরণের পেছনের কারণ হলো এদের শুকরছানার মতো লেজের উপস্থিতি। এই প্রাণীটিও বিপন্নপ্রায় এবং এরা সর্বোচ্চ ২৬ টি প্রাইমেটের একটি দলে বাস করে আর এদের বাসস্থান হলো উত্তরপূর্ব এবং দক্ষিণপূর্বের বনাঞ্চল।
হনুমান লেঙ্গুর হলো আরেকটি বিপন্নপ্রায় প্রজাতি। এরা সর্বোচ্চ ২৫ টির দলে দেশের মধ্য দক্ষিণপশ্চিম অঞ্চল, কেশবপুরের লোকালয়ে বাস করে।

৪. হাতি

এই বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিটিকে রক্ষার জন্য কাজ করা হচ্ছে এবং এরা দেশের পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি বনাঞ্চলের মধ্যে সিমাবদ্ধ। সমগ্র ভারত এবং বাংলাদেশে মাত্র ৩৫০ টি বন্য হাতি এবং ৫০ টি গৃহপালিত হাতি অবশিষ্ট রয়েছে। এই প্রজাতির হাতি এদের আফ্রিকান পূর্বপুরুষের তুলনায় ছোট আকৃতির, তবে এখনও পুরুষ হাতির গড় উচ্চতা ২.৭ মিটার এবং ওজন প্রায় ২.৭ টন হতে পারে। অতীতে যেমন ভাবে চিন্তা করা হতো, হাতি তার তুলনায় অনেক বেশি বুদ্ধিমান, এবং এরা অনুকরণ ও পরার্থপরতার মতো আবেগ দেখায়। প্রায়শই এদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং ভ্রমণকারীদের বহনের কাজে ব্যবহার করা হয়।

৫. ইরাওয়াদি ডলফিন

খুব সম্প্রতি আবিষ্কৃত এবং খুবই বিরল বাংলাদেশের এই ডলফিনগুলো ভারত মহাসাগরে বাস করে। অভ্যাস পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মাছ ধরার জালের কারণে এগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়, মনে হচ্ছে এরা বাংলাদেশে একটি অভয়ারণ্য পেয়েছে। এই ইরাওয়াদি ডলফিনগুলো প্রায় ৮ ফুট লম্বা হতে পারে, যা মানুষের তুলনায় খুব একটি বড় নয়, এবং এদেরকে তাদের তুলনামুলকভাবে মোটা মাথার মাধ্যমে আলাদা করা যায়। এরা পানি ছুড়তে পারে, যা এই প্রজাতির একটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। পরিভ্রমণরত একটি দলে সর্বোচ্চ ৬ টি ডলফিন থাকতে পারে।

৬. কাঠবিড়ালি

কালো বৃহদাকার কাঠবিড়ালি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মানুষের আনাগোনা কম এমন এলাকার গাছের মধ্যে পাওয়া যায়। এরা সর্বোচ্চ ৫৮ সে. মি. পর্যন্ত হতে পারে (লেজ বিবেচনায় না নিয়ে, যা প্রায় ৬০ সে. মি. পর্যন্ত হতে পারে)। এর পেছন পিঠ, কান এবং লেজ কালো রঙের এবং সামনের অংশ হালকা রঙের।
ভুটান জায়ান্ট ফ্লায়িং কাঠবিড়ালিও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বনের মধ্যে পাওয়া যায়। এর গোলাপি রঙের শীর্ষসহ উজ্জ্বল বাদামি লোম রয়েছে।
ইরাওয়াদি কাঠবিড়ালি এদের সমগোত্রীয় অন্যান্য বৃহদাকার কাঠবিড়ালির তুলনায় ছোটখাটো। এই প্রজাতির কাঠবিড়ালির সাতটি উপ-প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে পাল্লা কাঠবিড়ালি (পেটের নিচের দিক নানা বর্ণের), প্লেনটেইন কাঠবিড়ালি (ফলচাষীর শত্রু) এবং প্রেভস্ট কাঠবিড়ালি (পেছনের দিক কালো এবং পাজরের দিক সাদা)।

৭. ইঁদুর

যদিও সাধারণত ফসলের বালাই হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে কিছু লোক ইঁদুরকেও তাই মনে করে। তবে, গৃহে বড় হওয়া ইঁদুর থেকে বুনো ইঁদুর অনেক বড় আকৃতির হয়ে থাকে।
একটি লেসার ব্যাম্বো র‍্যাট-কে লেসার হিসেবেও ডাকা যায়, কিন্তু এর আকৃতি এতোটাই বড় যে তা আপনার হাতে আঁটবে না।
লেসার বেন্ডিকুট র‍্যাট (যা ভারতীয় মোল-র‍্যাট বা পিগ-র‍্যাট নামেও পরিচিত) প্রায় ৪০ সে. মি. পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আক্রমণ করার সময় এরা ঘোঁত ঘোঁত শব্দ করে, যার কারণে এদেরকে পিগ-র‍্যাট নামে ডাকা হয়। হুমকির মুখে পড়লে গৃহস্থালিতে এরা বেশ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

৮. ষাঁড়/বলদ

বলদ (খোজা করা প্রাপ্তবয়স্ক ষাঁড়) বাংলাদেশ খুবই কাজের একটি প্রাণী, যা বিশেষভাবে চাষবাসের কাজে ব্যবহৃত হয়। এগুলো পরিবহন, চাষবাস, গাছের গুড়ি টানা বা মাড়াইয়ের কাজ করতে পারে, যা এদেরকে কৃষিকাজের জন্য চমৎকার প্রাণিতে পরিণত করেছে। একটিমাত্র প্রাণী থেকে একজোড়া অনেক বেশি কাজের, বিশেষ করে অনেক শ্রমসাধ্য কাজের ক্ষেত্রে। এরা ঘোড়ার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং অনেক বেশি শান্ত।

৯. নানা ধরণের পাখপাখালি

বাংলাদেশে ৪৬৬ প্রজাতির পাখি রেকর্ড করা হয়েছে। পোষা প্রাণী হিসেবে পাখি বেশ জনপ্রিয়, কিন্তু বনবাদাড়ে অনেক চমৎকার প্রজাতিও পাওয়া যায়।
ট্রপিকবার্ড আপাদমস্তক সাদা এবং এরা ক্রান্তীয় মহাসাগর থেকে আসে। পৃথিবীর মধ্যকার মাত্র ৩ টি প্রজাতির মধ্যে একটির আবাস হলো বাংলাদেশ।
ফ্যামিঙ্গো কেবলমাত্র বনভূমির অলংকার নয়; এরা প্রধানত গোলার্ধের পুরবাঞ্চলে বাস করে। সারা বিশ্বের ৬ টি প্রজাতির মধ্যে, একটি বাস করে বাংলাদেশে।
পাল্লা ফিশ ইগল (বা দাগজুক্ত-লেজবিশিষ্ট মৎস্য শিকারি ইগল)-এর শরীরের অধিকাংশ জায়গাই বাদামি, শুধুমাত্র সাদা মুখমণ্ডল ছাড়া। অধিকাংশ সময় এরা মিঠাপানির মাছ শিকার করে। এরা বৃহদাকার শিকার ধরার জন্য বেশ পরিচিত, এবং মাঝে মাঝে এরা এদের শরীরের দ্বিগুণ ওজনের ভার বহন করতে পারে।
সমগ্র ক্রান্তীয় অঞ্চলে জাকানাস নামক জলচর পাখি পাওয়া যায়। এরা অগভীর হ্রদে বাস করে এবং এদের বৃহদাকার পা এবং থাবা ব্যবহার করে ভাসমান জলজ উদ্ভিদের উপর দিয়ে সহজেই হেঁটে চলে। এই প্রজাতির মধ্যে ২ টি বাংলাদেশে বাস করে।
অস্বাভাবিক নিশাচর পাখিদের জন্য নাইটজার হলো একটি উপযুক্ত নাম যারা মাটিতে বাসা বাঁধে। এরা মাঝারি আকৃতির হয় এবং এদের পা ও পায়ের পাতা ছোট হয়, লম্বা ডানা আর ছোট ঠোঁট থাকে। এদের বর্ণ পাতা বা বাকলের রঙের মতো হয়ে থাকে। এই প্রজাতির মধ্যে ৩ টি বাংলাদেশে পাওয়া যায়।

১০. লাসা অ্যাপসো

বাংলাদেশে কেবল পাখিই একমাত্র পোষা প্রাণী নয়; কুকুরও বিশ্বস্ত সঙ্গী। লাসা অ্যাপসো জনপ্রিয় প্রজাতিগুলোর মধ্যে একটি। এদের উৎপত্তি হলো তিব্বত এবগ্ন এদের লম্বা, সোজা চুলের কারণে সহজেই সনাক্ত করা যায়, যেগুলো হাঁটার সময় মাটি স্পর্শ করে। এরা সব ধরণের রঙের হতে পারে। এরা চমৎকার প্রহরী কুকুর হয়, কারণ এরা খুবই প্রভুভক্ত হয় এবং অপরিচিত লোকদের ব্যাপারে সতর্ক থাকে। এরা ১২-২০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে এবং এদের শারীরিক অসুস্থতাও খুবই কম হয়। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সমতলে থাকুক আর আপনার বাসার পেছনের জঙ্গলেই খাকুক (পোষা প্রাণী হিসেবে), দেখা এবং জানার জন্য অনেক মজাদার প্রাণী রয়েছে।

সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

Comments

comments