বাংলাদেশে ব্যবহৃত গাড়ী কেনার কৌশল

Share

এখনকার দিনে ব্যবহৃত গাড়ীর বাজার উল্লেখযোগ্য পরিমানে কার্যকরি হতে দেখা যাচ্ছে। এটাকে মোবাইলের উর্ধ্বমুখী, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তৃতির সাথে সাথে নিজস্ব গাড়ী চালানোর আকাক্সক্ষা এবং প্রতি তিন থেকে চার বছরে পরিবারগুলো ভেঙে যে নতুন পরিবার গঠন হচ্ছে তারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে। অনলাইনে সেকেন্ডহ্যান্ড (অন্যের হাতে আগে ব্যবহার হওয়া) গাড়ী বিক্রির সংখ্যাও প্রতিনিয়ত ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যদি কেউ একজন একটি ব্যবহৃত গাড়ী কিনতে যান তাহলে, এই ব্যবহৃত গাড়ী ক্রয় করার ক্ষেত্রে তার অনেক বেশি মানসিক চাপের অভিজ্ঞতা হবে। কেননা যখন আপনি একটি ব্যবহৃত গাড়ী দেখবেন এবং কেনার জন্য ঠিক করবেন তখন আপনাকে অনেক অজানা পরিবর্তন ও বিষয়ই অকপটে বিবেচনায় নিতে হবে এবং মেনে নিতে হবে। আর গাড়ীটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যখন চিন্তা করবেন এটি কি আপনার জন্য সঠিক হবে কিনা। এক্ষেত্রে একটি অনুশীলন যথেষ্ট। যখন একটি ব্র্যান্ড নিউ গাড়ী কেনা হয় তখন সেই গাড়ী সম্পর্কে তথ্য পাওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। কারণ নতুন গাড়ী সম্পর্কে আপনার যেসব তথ্য প্রয়োজন তার সবই ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। কিন্তু ব্যবহৃত গাড়ীর ক্ষেত্রে, ওই গাড়ীর আগের অবস্থা এবং মানের ইতিহাস এবং গাড়ীটি কিভাবে ড্রাইভিং করা হয়েছে ও কিভাবে রক্ষাণাবেক্ষণ করা হয়েছে ইত্যাদির একটি বড় অংশ আপনি জানেন না, যা শুধু আগের ব্যবহারকারীই সবচেয়ে ভালো জানেন। গাড়ীর অধিকাংশ মেকানিক্যাল পার্টস আপনার কাছে সত্যিই দৃশ্যমান হবে না। আর এটা গাড়ী কেনার ক্ষেত্রে আপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এজন্য যদি সম্ভব হয়, গাড়ীর আগের মালিক গাড়ীটি কিভাবে যতœ নিয়েছে, চালিয়েছে তা খুঁজে বের করুন এবং অতীতে সম্ভাব্য বড় ধরণের কোন যান্ত্রিক সমস্যা, ত্রুটি বা ব্যর্থতা হয়েছিল কিনা তাও জানার চেষ্টা করুন।

যখন আপনি ব্যবহৃত একটি গাড়ী কিনতে যাবেন তখন কিভাবে সঠিকভাবে যাচাই করবেন এবং ঝুঁকি কমাবেন তার কিছু উপায় বা কৌশল রয়েছে। নিচে এধরণের কিছু টিপস উল্লেখ করা হলো:

2

ব্যবহৃত গাড়ী কিনতে গেলে অবশ্যই মধ্যস্বত্বভোগী অথবা শোরুম হতে কেনা থেকে বিরত থাকুন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, যে সব মধ্যস্বত্বভোগী অথবা শোরুমে আপনাকে ব্যবহৃত গাড়ীটি দেখানো হচ্ছে সেই গাড়ী এবং গাড়ীর বিগত দিনের ইতিহাস (অতীতে ব্যবহার) সম্পর্কে তাদের সম্পূর্ণ ধারণা নেই এবং গাড়ীর কন্ডিশন সম্পর্কে যেসব উদ্দীপনা ও অনুপ্রেরণাদায়ক কথা বলা হবে তার কোনটিই সত্য নয় (কথাটি শুনতে খারাপ লাগবে, তবে কিছু কিছু গাড়ীর মালিক সত্যিই অনেক সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ন)। উপরন্তু অধিকাংশ মধ্যস্বত্বভোগী তাদের লাভের সীমাকেই সবার আগে এবং সবচেয়ে বেশি বিবেচনা করে ও অটুট রাখার চেষ্টা করবে। তাই তাদের সাথে গাড়ীর দাম নিয়ে আলোচনা করা (দাম নিয়ে দরাদরি) একটু কঠিন এবং তাদের সাথে আলোচনা করে গাড়ী কিনলে আপনাকে প্রয়োজনের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেশি পরিশোধ করতে হবে।

ব্যবহৃত গাড়ী কেনার ক্ষেত্রে সবসময় গাড়ীটি ড্রাইভিং করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করার উপর জোড় দিন। কারণ গাড়ী বাইরে থেকে দেখা এবং গাড়ীতে চড়া (আরোহন করা) এটা আসলে ড্রাইভিং করে বোঝা থেকে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। গাড়ী বাইরে থেকে দেখে সুন্দর ও ভাল মনে হলেও যতক্ষণ না আপনি গাড়ী ড্রাইভ করবেন ততক্ষণ কিছু বিষয় যেমন গাড়ীর ব্রেক, স্টিয়ারিং এর রেসপনস (প্রতিক্রিয়া বা কেমন কাজ করে), চাকার বিয়ারিং এর শব্দ বা এর কোন সমস্যা আছে কিনা এবং এক্সিলারেটের (গতি বৃদ্ধি) ক্ষেত্রে ইনপুট ইঞ্জিনের সংবেদনশীলতা (মান ও অবস্থা) কেমন তা বোঝা সম্ভব নয়। আপনি নিজে গাড়ী ড্রাইভ না করলে গাড়ীর এই গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সম্পর্কে কখনই প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারবেন না। আপনি যদি এই বিষয়গুলো ভালোভাবে না জানেন বা সঠিকভাবে বিচার বিবেচনা করতে না পারেন তাহলে এমন একজন পরিচিত মেকানিক অথবা একজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে যান যিনি ওই নির্দিষ্ট মডেলের গাড়ী (যেটি কেনার জন্য মনস্থির করা হয়েছে) সম্পর্কে ভালো জানে এবং যখন গাড়ীটি ড্রাইভ করা হয় তখন ইনপুট ইঞ্জিন কেমন রেসপনস করে তা বুঝতে পারে।

যখন গাড়ী কেনার জন্য দেখা হয় তখন চেসিসের স্টিফনেস এবং স্ট্রেইটনেস পরীক্ষা করেছেন তা নিশ্চিত হয়ে নিন। এই দেশে যেখানকার সড়কে এমন আইন দৃষ্টিগোচর হচ্ছে এবং প্রতিনিয়তই ঘটছে যে, যেভাবেই হোক “আপনার নিজের পথ নিজে তৈরি করে নেয়া”। বর্ধিত সময়সীমার মধ্যে ব্যবহৃত হয় এসব গাড়ীরই অন্তত একটি দৃষ্টান্ত অবশ্যই আছে যেখানে এগুলো ফেন্ডর বেন্ডরে (মোটরযানের মধ্যে ছোটখাট সংঘর্ষ) জড়িত হয়েছে। তাই এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, গাড়ীর চেসিস কি নষ্ট হয়েছে নাকি ভালো আছে। একটি টর্চলাইট নিন, হুডটি তোলেন, এর পার্শ্বগুলো পরীক্ষা করুন, ইঞ্জিনের দুই পার্শ্বের মেটালের উপরিভাগ, পাশাপাশি দুই হেডলাইট জুড়ে যে মেটালগুলো রয়েছে তা পরীক্ষা করুন। যদি সেখানে কোন ধরণের ঢালাইয়ের প্রমান বা চিহ্ন (উচু-নিচু, এবড়ো-থেবড়ো, স্কুইগলি লাইন বা অস্বাভাবিক দাগ, সমতল মেটাল থেকে মেটাল কিছুটা বর্ধিত) পাওয়া যায় অথবা যদি বেকে যাওয়ার কোন চিহ্ন বা প্রমান, বাড়তি খোলা কোন মেটাল পাওয়া যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় এবং এই চিহ্নগুলোর অর্থ হচ্ছে গাড়ীর চেসিসটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পরবর্তীতে এটি মেরামত করা হয়েছে। একইভাবে কার্পেটটি সরিয়ে নিয়ে গাড়ীর ট্রাঙ্ক (গাড়ীর মূল বডিটি) এবং অতিরিক্ত চাকার দুই সাইডই পরীক্ষা করে নিন।

গাড়ীর বডিতে এক্সিডেন্ট অথবা অন্য কোন কারণে কোন ধরনের ক্ষতির চিহ্ন আছে কিনা তা দেখে নিন। কিছুটা ঝুঁকে গিয়ে (নিচু হয়ে বা কাছ থেকে) গাড়ীর পিছন থেকে সামনের দিক পর্যন্ত এবং গাড়ীর নিচের দিকের অংশটুকু ভালোভাবে দেখে নিন। পুনরায় অন্য পাশটিও ভালোভাবে দেখে নিন। যদি বডি প্যানেলে (যা দিয়ে বডিটি তৈরি) উচু-নিচু, এবড়ো-থেবড়ো বা ঢেউ খেলানো থাকে তাহলে বুঝতে হবে গাড়ীর বডির ওই পাশটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাড়ীর দরজাগুলোর প্যানেলে, হুড এবং ট্রাঙ্কে কোন ধরণে ফাঁকা আছে কিনা তাও পরীক্ষা করে নিন। বডির যে অংশগুলো খোলা হয় সেগুলোর মধ্যে যদি ফাঁকা থাকে এবং উভয় অংশের মধ্যে যদি সঙ্গতিপূর্ণ না হয় (উদাহরণ স্বরূপ, হুডের ডান এবং বাম দিকের হুড ও ফেন্ডরের মধ্যে ছোট গ্যাপ), তাহলে বুঝতে হবে গাড়ীর এই বডিটিতে বড় ধরণের ক্ষতি হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তা মেরামত করা হয়েছে।

যখন আপনি কোন ব্যবহৃত গাড়ী কিনবেন তখন ওই গাড়ীর ইঞ্জিন পরীক্ষা করা হলো সবচেয়ে সহজ। ইঞ্জিন পরীক্ষার সহজ পদ্ধতি হলো, ড্রাইভারের সিটে বসুন এবং ড্রাইভ করে দেখুন। ড্রাইভ করার সময় যদি ইঞ্জিন স্লো রেসপনস করে এবং এর শব্দ যদি হুইজি এবং নিয়ন্ত্রিত মনে হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে ধরে নিন ওই গাড়ীর ইঞ্জিনটি অন্তিমশয্যায় (সময় শেষ)। গাড়ী দাঁড় করিয়ে এর হুডটি তুলুন, ইঞ্জিন চালু রাখুন এবং এসি অন করে দিন- ইঞ্জিনের শব্দ পরীক্ষার জন্য পিকআপ বাড়িয়ে কমিয়ে খড় খড় শব্দ শুনুন, ক্রমাগত কম শব্দ করুন এবং আকস্মিকভাবে দ্রুত অত্যধিক শব্দ করুন। হ্যান্ডব্রেক অন করে গাড়ী গিয়ারের মধ্যে রাখুন, যখন গিয়ারের মধ্যে রাখা হয় তখন যদি ইঞ্জিন অত্যধিক শব্দ করে এবং ঝাঁকি দেয় তাহলে ইঞ্জিন ও গিয়ারবক্স মাউন্টিংস ক্ষতিগ্রস্ত। আর গাড়ীটি কেনার আগে অবশ্যই কোন ওয়ার্কশপে নিয়ে যান এবং সেখানে গাড়ীর ফ্যাসিলিটিজগুলো পরীক্ষা করুন এবং ইঞ্জিনের চাপও পরীক্ষা করে নিন।

গাড়ীর স্কাফ মার্কসের অভ্যন্তরে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করুন। বিশেষ করে দরজার হ্যান্ডলগুলো, জানলার সুইচ এবং ড্যাশবাক্স। দরজায় স্কাফ মার্কসসহ সেকেন্ডহ্যান্ড (অন্যের হাতে ব্যবহার হওয়া) গাড়ী কেনা মানে হচ্ছে, এতে আপনি দেখতে পাবেন ধোলাইখাল থেকে স্কাফ মার্কস কিনে দরজায় লাগিয়ে দেয়া হয়েছে এবং এটি সস্তাও নয়। আর গাড়ীর ছাদের ভিতরের অংশে যদি খোঁচা-খোঁচা রুক্ষ রেশমের কার্পেট এবং কিছুটা বেড়ে থাকে, তাহলে এই গাড়ীটিতে পানি ঢুকেছে (প্লাবিত হয়েছে)। আর আপনি নিশ্চয় এমন একটি গাড়ী কিনতে চান না যে গাড়ীটি পানিতে ভিজেছে এবং পানিতে ছিল, সেটা যে কারণেই হোক।

আর অবশেষে যখন গাড়ী কেনার সিদ্ধান্ত হবে তখন বড় বিষয় হচ্ছে গাড়ীর যেসব পার্টস বা অন্যান্য সমস্যা আছে তা ঠিক করা এবং মূল্য নিয়ে দরাদরি করা। বিক্রেতা আপনাকে বলবে গাড়ীটি আপনার কাছে বিক্রি বা হস্তান্তরের আগে আপনাকে সবকিছু ঠিকঠাক করে দেবে। কিন্তু এটা কখনই করবেন না। কারণ অনেকক্ষেত্রেই এমন হয় যে, বিক্রেতা আপনার কাছে গাড়ী হস্তান্তর করার আগে নিম্নমানের এবং নকল পার্টস দিয়ে ঠিক করে হস্তান্তর করে। আর এটি সব সময় ভালো হয়, যদি আপনি দাবি করেন যে, আপনি নিজে গাড়ীর পার্টসগুলো কিনবেন এবং ঠিক করে নিবেন।

3

এটা খুব কঠিন কাজ না, যে একটা ভালো ব্যবহৃত গাড়ী খুঁজে পাওয়া এবং ওই গাড়ী খুব সুন্দরভাবে ৫ থেকে ৬ বছর চালানো। এটা নির্ভর করে আপনি যখন গাড়ী খুঁজেন সেই প্রচেষ্টা এবং আপনার স্মার্ট সিদ্ধান্তের উপরই। যদিও রিকন্ডিশন অথবা ব্র্যান্ড নিউ গাড়ী কেনার চেয়ে সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ী কেনার পরও আরও অনেক কাজ আছে। তারা (বিক্রেতারা) আপনাকে খুব কম দামে একটি ভালো গাড়ী কেনার সুযোগ করে দিচ্ছে এবং সত্যিই আপনার নিজের একটি গাড়ীর অভিজ্ঞতা হবে। কারণ এটি আপনি সারিয়ে নিবেন এবং এরপর অনেক দিন চালাবেন। সম্পর্কের মতো করে এটি চিন্তা করুন যার সাথে আপনাকে ক্রমাগত কাজ করতে হবে এবং আপনার নিজেকে জিজ্ঞেস করুন এটা আপনার কাছে কতটা মূল্যবান।

সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

Comments

comments