কিভাবে আপনার পোষা খোড়গোশটির যত্ন নিবেন

Share

পোষা খোড়গোশের সঠিক যত্ন নেওয়া একটি বিশেষ দায়িত্ব। পোষা খোড়গোশটির জন্য যথেষ্ট থাকার যায়গা, পুষ্টিকর খাবারের তালিকা, পশু চিকিৎসকের দ্বারা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ আদর যত্ন আর ভালবাসা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ন।

নিচে খোড়গোশের কিছু মৌলিক চাহিদা দেওয়া হয়েছে যার সঠিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদেরকে একটি সুখী এবং স্বাস্থ্যকর জীবন দেওয়া যেতে পারে:

পোষা খোড়গোশের ঘর:

খোড়গোশের থাকার গতানুগতিক বাক্সগুলো অনেক বেশী অবরোধ্য হয় যা অনেকাংশে তাদের প্রয়োজনীয়তা পূরনে ব্যার্থ্য। চারিদিক দিয়ে ঢাকা অল্প জায়গার এই বাক্সগুলো চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটিয়ে তাদের আচার আচরন এবং স্নায়ুবিক সমস্যা তৈরী করে। তাছাড়া, মেঝে যদি অতিরিক্ত শক্ত হয় অথবা তাড় দিয়ে তৈরী হয় তবে ক্ষত তৈরী করতে পারে অথবা পায়ের সমস্যা তৈরী করতে পারে।

একটি নির্ভূল খোড়গোশের থাকার বাক্স:

একটি আদর্শ খোড়গোশের বাক্সে যথেষ্ট যায়গা থাকবে যাতে সে তার পিছনের পায়ে পুরোপুরি দাড়াতে পারে এবং চলাচলের জন্য যথেষ্ট জায়গা থাকে; কমপক্ষে, একপায়ে পরপর তিনবার লাফানোর মত জায়গা থাকতে হবে। এখানে আরো কিছু উপায় উল্লেখ করা হল যার সমন্বয়ে একটি আদর্শ খোড়গোশের বাক্স তৈরী করা যেতে পারে:

মেঝে এবং চারিদিকের দেয়ালগুলো কঠিন হতে হবে যা ঘুমানো এবং লুকিয়ে থাকার জন্য আশ্রয় দিবে। ঘুমানোর জন্য মেঝে ঢেকে দিতে হবে নরম এবং শোষনযোগ্য উপকরন দিয়ে যেমন খড়, ঘাস, কুঁটা অথবা ঘন্ধ নেই এমন গাছের গুড়ো দিয়ে এবং প্রতিদিন তা পরিস্কার করতে হবে; মূল-মূত্রের জন্য লিটার ট্রে দেওয়া যেতে পারে। মেঝে কোন অবস্থাতেই তাড় দিয়ে তৈরী করা যাবে না।

বাংলাদেশের চরম আবহাওয়া থেকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে বিশেষকরে, বৃষ্টি এবং বাতাস থেকে। বাক্সের ছাদটির একদিকে ঢাল থাকবে এবং শক্ত হতে হবে যাতে বৈরী আবহাওয়া থেকে পশুগুলোকে রক্ষা করা যায় এবং এমনভাবে ঝুলাতে হবে যাতে সহজেই পরিস্কার করা যায়। পুরো ব্যবস্থাটি মাটি থেকে উপরে হবে যাতে তা স্যাঁতস্যাঁতে না হয়ে যায়। বাগানে আংশিক ঢাকা কোন স্থান পছন্দ করা যেতে পারে যেখানে যথেষ্ট সূর্যের আলো পৌছে (বিশেষকরে, সকালের আলো) কিন্তু অতিরিক্ত তাপ এবং বাতাস থেকে নিরাপদ।

এমন উপাদান দিয়ে তৈরী করতে হবে যা চিবিয়ে নষ্ট করা যায় না এবং সহজেই পরিস্কার করা যায়। সপ্তাহ ভিত্তিতে থাকার বাক্সটি ধোয়া-মাজা করতে হবে।

কাঠের খেলনা, গাছের নরম শাখা এবং পুরু ও শক্ত কাগজ ছাড়াও খাবার বাটি, পানির পাত্র, চাবানোর খেলনা এবং ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য কেঠো থাকা প্রয়োজন।

আলো বাতাসের যথেষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে। চারিপাশ তারের জাল দিয়ে তৈরী হলে চমৎকার আলো বাতাসের ব্যবস্থা তৈরী হতে পারে যা একিই সাথে মশা-মাছির হাত থেকেও পোষা প্রানী নিরাপদ রাখতে পারে।

টীকা: একটি পোষা খোড়গোশকে পুরোপুরিভাবে কারারুদ্ধ করে রাখা কোন অবস্থাতেই কল্পনা করা যায় না এবং তাদের জন্য এটি মা্রাত্মক ক্ষতির কারনও হতে পারে। আজকাল, অনেক পোষা খোড়গোশ বাড়ির ভিতরে রখার ব্যবস্থা করা হয় অথবা বাসার ভিতরে প্রবেশের অধিকার থাকে যাতে তারা পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে যায়।

খড়গোশের প্রতিদিন কতটুকু অনুশীলন করা উচিৎ?

একটি পোষা খোড়গোশকে প্রতিদিন তাদের নির্দিষ্ট পরিবিশের বাহিরে অনুশীলন করতে দেওয়া উচিত; বিশেষকরে, চার ঘন্টা অথবা তারও বেশী যাতে খোলামেলা পরিবেশে ঘুরতে পারে। নেতিবাচক আচরন বন্ধ ছাড়াও, নিয়মিত অনুশীলন স্নায়ুবিক সমস্যা, স্থূলতা এবং অন্ত্রের সমস্যাও নিয়ন্ত্রনে রাখবে।

খাঁচার বাহিরে কখনও আপনার পোষা খোড়গোশটিকে চোখের আড়াল করবেন না যেহেতু তারা শিকারী প্রানীর কাছে অধিক অরক্ষিত অথবা সম্ভবত পালিয়ে যায় যখন বেখেয়ালীভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়। আকর্ষনীয় বাগান যেখানে গুল্মজাত উদ্ভিদ, গাছের গুড়ি আছে এরকম একটি স্থানের চারিদিক দেয়াল দিয়ে ঘেরা থাকলে খোড়গোশের জন্য একটি আদর্শ জায়গা তৈরী হয় যেখানে তারা তাদের পছন্দ মত অনুশীলন, ঘোরাঘুরি এবং ঘাসের উপর আরাম করতে পারে।

বাসার ভিতরে থাকার জায়গা:

খোড়গোশ স্বভাবগত ভাবে নরম এবং শান্ত আর ঘরের ভিতরে আরামদায়ক পরিবিশে সহজেই তারা নিজেদের মানিয়ে নেয়। বেশীরভাগ মানুষের চিন্তার বিপরীতে, খোড়গোশ আসলে বাচ্চাদের তুলনায় প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য ভাল পোষা প্রানী। বস্তুত, তারা শিকার যার মানে স্বভাবগতভাবে তারা অত্যন্ত সাবধান এবং অনেকটাই ভীত। কিন্তু, তারা আদর পছন্দ করে যেহেতু এটি তাদেরকে নিরাপদ অনুভূতি প্রদান করে। তারা আসলে অতিরিক্ত ঘাটাঘটি পছন্দ করে না তবে মাটিতে রেখে আদর-যত্ন তারা বেশী পছন্দ করে।

যদি আপনার খোড়গোশটি হয় ঘরে পোষা প্রানী, তাহলে আপনার ঘরটি হতে হবে এমন যেন তা বৈদ্যুতিক তাড় এবং সম্ভাব্য শর্ট থেকে নিরাপদ থাকে। বিষাক্ত কোন উদ্ভিদ কিংবা নির্দিষ্ট কোন ঝুকিঁপূর্ন স্থানে যাওয়ার বাধার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাদের সবসময় আগ্রহ করে তুলুন যাতে তারা তাদের নিজস্ব খেলার সামগ্রী চাবানোর অভ্যাস গড়ে তুলে, কার্ডবোর্ড বাক্সগুলো অথবা অন্যান্য কাঠের বস্তু পরিস্কার রাখুন।

লিটার ট্রে ব্যবহারে খোড়গোশকে যথার্থভাবে প্রশিক্ষন দেওয়া সম্ভব, বিশেষকরে প্রস্রাবের জন্য। তথাপি, এটি খুবিই সাধারন যে তারা যেখানে সেখানে প্রস্রাব করতে পারে। পরিষ্কার করে ফেলুন এবং তাদের ট্রেতে কিছু সময়ের জন্য রাখুন যাতে পরবর্তীতে তা ব্যবহারের অভ্যাস তৈরী হয়।

খাবার সময়:

খোড়গোশের জন্য ওন্ত্যোষ্টিজনিত সমস্যার প্রধান কারন হচ্ছে নিম্ন মানের খাদ্যভ্যাস। খোড়গোশের জন্য বানিজ্যিকভাবে যে সমস্ত খাবার বেশী পরিমানে পাওয়া যায় তার বেশীর ভাগেই খোড়গোশের খাবারের জন্য উপযোগী নয়। এই সমস্ত খাবার অতিরিক্ত অস্বাস্থকর চর্বিতে পূর্ন থাকে, অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট এবং খাদ্য আঁশের পরিমান প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম থাকে।

খোড়গোশের জন্য প্রাথমিক খাবারের একটি তালিকা:

ঘাস কিংবা তৃ্ণ ঘাস সবসময় খোড়গোশের জন্য উপযুক্ত। বাগানের আগাছা সহ সবধরনের ঘাস দেওয়া যেতে পারে তবে খেয়াল রাখতে হবে ছেঁটে ফেলতে হয় ঘাসের এমন অংশ না দেওয়াই ভাল কারন সেই অংশটি অত্যন্ত মলিন থাকে। তাদেরকে লুসার্ন তৈরী করে দেওয়া যেতে পারে কিন্তু খুবিই অল্প পরিমানে। কারন, খোড়গোশের জন্য এতে অতিরিক্ত পরিমানে ক্যালসিয়াম থাকে।

মাঝে মাঝে ফল দেওয়া যেতে পারে বিশেষ খাবার হিসেবে। প্রতিদিন কয়েক চামুচ করে কমলা, আপেল, স্ট্রবেরী এবং নাশপাতির রস দিতে হবে।

বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি দিন, বিশেষকরে সবুজ শাকসবজি যেমন লতাশাক, বোক চোরি, ব্রুসেল স্প্রাউটস, বাঁধাকপি এবং ফুলকপি। খোড়গোশ ব্রোকলি, মটড় শুঁটি, গাজর, বিভিন্ন ধরনের লেটুস, হার্বস, স্প্রাউটস, মূলা এবং বসন্ত পেঁয়াজও পছন্দ করে। কিছু লোক মনে করে খাঁচার বাহির থেকে গাজর খেতে দিয়ে খোড়গোশদের পোষ মানানো সহজ হয় এবং এতে তাদেরকে বেশী সময় খাবারে ব্যাস্ত রাখা যায়। ভূট্টা, আলুর খোসা অথবা রেউচিনি মটরশুটি খাওয়ানো এড়িয়ে চলুন।

– খাবারগুলো ছোট ছোট দলা বানিয়ে খেতে দিন এবং খোড়গোশের জন্য তৈরী খাবারের দ্রবন এড়িয়ে চলুন।

– কোন সম্পূরক খাবার কিংবা লবন দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

– গাছের নরম শাখা কিংবা কাঠি চাবানো খোড়গোশের জন্য খুবিই স্বাস্থকর।

একটি পরিষ্কার পাত্রে বিশুদ্ধ পানি সব সময় এমন ভাবে দিতে হবে যেনো তা উপর হয়ে পড়ে না যায়। কিছু পানির পাত্র পাবেন যা এমন ভাবে তৈরী করা যেন তা খাঁচার দেয়ালের সাথে ঝুলিয়ে রাখা যায়। মনে রাখবেন, খোড়গোশ অতিরিক্ত তাপের চাপের প্রতি অধিক সংবেদনশীল, বিশেষকরে বাংলাদেশের গুমোট জলবায়ূ সম্পন্ন এলাকাগুলোতে। তাই, ঐসমস্ত এলাকাগুলোতে তাদের ঘরের ভিতরে অথবা কমপক্ষে সূর্যের আলো থেকে ছায়ায় রাখতে হবে। অতিরিক্ত গরমের সময় তাদের ঠান্ডা খাবার পানির বোতল দিন যাতে তারা হীম-শীতল ছোয়া পায় এবং ঘামিয়ে না যায়।

সঙ্গীদলের ব্যবস্থা রাখা:

বেশীরভাগ খোড়গোশ সামাজিকভাবে থাকতে পছন্দ করে, তাই তাদেরকে অন্যান্য খোড়গোশদের সাথে থাকতে দেওয়া সাধারনত ভাল একটি সিদ্ধান্ত। একই লিঙ্গের কিংবা ক্লীব লিঙ্গের খোড়গোশদের একসাথে রাখা যায়। মনে রাখতে হবে, একসাথে থাকার প্রথমদিকে খুব ভাল নজড় রাখতে হবে কারন একে অন্যের উপর হানা করে মারাত্মক ক্ষত তৈরী করতে পারে।

পরিযর্চা:

পুরোপুরিভাবে মার্জন উপভোগ করা ছাড়াও, নিয়মিত পরিযর্চা করা খোড়গোশের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বড় পশম যুক্ত খোড়গোশের জন্য নিয়মিত ব্রাশ করা অত্যাবশ্যকীয় যাতে অতিরিক্ত পশম পড়ে যায় এবং “হেয়ার বল” তৈরী হতে না পারে। খোড়গোশ বমি করতে পারে না এবং “হেয়ার বল” তাদের অন্ত্যের সমস্যার অতি পরিচিত একটি কারন। আপনার খোড়গোশের নিয়মিত পরচর্যা ভবিষ্যতে তৈরী হতে পারে এমন অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে।

ডি সেক্সিং এবং টীকা দান:

বাংলাদেশের সমস্ত পোষা খোড়গোশের আর, সি, ডি, টীকা (র‌্যাবিট ক্যালিসিভিরাস) দেওয়া বাধ্যতামূলক। দূর্ভাগ্য হলেও সত্য আর, সি, ডি, খোরগোশের জন্য দ্রুত মৃত্যুর কারন হতে পারে। আক্রান্ত হয়ার সাথে সাথে, ১২ থেকে ১৮ ঘন্টার মধ্যেই হার্ট অথবা শ্বাসনালীর সমস্যায় মৃত্যু হতে পারে। বর্তমানে, আর, সি, ডি, রোগের কোন চিকিৎসা নেই। তাই পোষা খোড়গোশদের বয়স ১০ থেকে ১২ সপ্তাহ হলেই পশু চিকিৎসকের দ্বারা টীকা দিতে হবে। এই মুহূর্তে এটিই যথেষ্ট হবে। পরবর্তীতে, রোগ প্রতিরোধের জন্য বছরে একবার করে চিকিৎসকের কাছে দেখা করানো উচিৎ।

খোড়গোশ এবং ক্যান্সার:

পরিসংখ্যান বলে যে, স্ত্রী খোড়গোশদের মধ্যে ৮০ ভাগ জরায়ূ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় যদি না তাদের সেচন করা হয় এবং এটি চিকিৎসকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি পরামর্শ। ক্যান্সার প্রতিরোধে, এটি এই রোগের আক্রমনকে প্রতিরোধ করে, একসাথে মিলিত হয়াকে নিরাপদ করে এবং ঘরের ভিতরে রেখে পোষ মানাতে সহায়তা করে। উপদেশ দেওয়া হয়ে থাকে যে, ৫ থেকে ৬ মাস বয়স হলে পুরুষ এবং স্ত্রী খোড়গোশদের ডি সেক্সিং করিয়ে নেওয়া ভাল।

পোষা কুকুর এবং বিড়ালের মত, একটি পোষা খোড়গোশকেও বছরে একবার চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন যাতে তারা একটি স্বাস্থকর জীবনমান পেতে পারে। আপনার সুবিধার্থে বার্ষিক আর, সি, ডি, টীকা দানের সময় চেক আপ করিয়ে নিতে পারেন। আপনার উপস্থিতিতে খোড়গোশের পায়ের নখ এবং দাঁত প্রয়োজনে পরিষ্কার করে নিন।

এখানে পোষা খোড়গোশ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আপনাকে আপনার খোড়গোশটির জন্য এমন একটি পরিবেশ চিশ্চিত করবে যা তাদের নিরাপদ এবং সুখী রাখবে।

সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

Comments

comments