রাস্তায় চলতে মোবাইল ফোন ও ক্লান্তি কেন সবচেয়ে বড় বিপদ!

Share

বাংলাদেশে গাড়ি চালানো একটি বড় দায়িত্বের ব্যাপার, যা হালকাভাবে নেয়া মোটেও উচিত নয়। যদিও বেশিরভাগ মানুষ এটি নিয়ে ভাবে না, তবুও যথাযথ পূর্বসতর্কতা অবলম্বন না করলে গাড়ি চালানো একটি বিপদজনক কাজ হয়ে উঠতে পারে। চালক যদি সামান্য কয়েক সেকেন্ডের জন্যও অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন তবে গাড়ি, ভ্যান, ট্রাক এবং অন্যান্য মোটরযানগুলো যেকোনো মূহুর্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রে পরিণত হয়ে খুব সহজেই মানুষ হত্যা করতে পারে। সুতরাং, কেউ যখন যেকোনো প্রয়োজনে মোটরযান চালান তখন তার উচিত রাস্তার দিকে পরিপূর্ণ ও নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ নিবদ্ধ রাখা। সামান্য অন্যমনস্কতা চালক কিংবা পথচারি, যারা হেঁটে অথবা বাইকে করে চলাচল করেন, তাদের যে কারো মৃত্যু ঘটাতে পারে। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, তারপরেও যানবাহন সংক্রান্ত এমন বিভিন্ন ধরনের প্রাণঘাতী দূর্ঘটনার সম্ভাবনা থেকে যায় যেগুলো এড়াতে গাড়িচালনার কাজটিকে গতানুগতিকতার চাইতে একটু বেশি গুরুত্বের সাথে করতে হয়। গাড়িচালনা সংক্রান্ত নিরাপত্তার ব্যাপারটি নিতান্তই সাধারণজ্ঞানের সাথে সম্পর্কযুক্ত। রাস্তায় যখন প্রবল ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় এবং সামনের কোনো কিছুই দৃষ্টিগোচর হতে চায় না, তখন আপনার সাধারণজ্ঞানই আপনাকে বলে দেবে যে, ঝড় না থামা পর্যন্ত গাড়ি চালানো ঠিক নয়। একইভাবে, এই ধরনের আরও কিছু বিপদ রয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের গাড়িচালকেরা একটু মাথা খাটালেই এড়াতে পারেন।
গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিপদ
বহু বছর যাবত, যানবাহন দুর্ঘটনা, আঘাত এবং প্রাণসংহারী ঘটনার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো। যাহোক, মোবাইল ফোনের আবিস্কার আমাদের চলতি পথের এক বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল অনেকেই গাড়ি, ভ্যান বা অন্যান্য মোটরযান চালানোর সময় তাদের মোবাইল ফোনে কথা বলে থাকেন। মনোযোগের এই অভাব প্রায়শই বিয়োগান্তক ঘটনার জন্ম দেয়। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করার সমস্যাটি বিশ্বব্যাপি এক মহামারির আকার ধারণ করেছে। বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই বিপুল সংখ্যক দুর্ঘটনা, আঘাত ও প্রাণসংহারী ঘটনার প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে, যা সরসারি এমনসব গাড়িচালকদের সাথে সম্পর্কিত যারা গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করছিলেন। যাহোক, গাড়ি চালানো অবস্থায় ফোনে কথা বলার প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রে মুক্তহস্ত ডিভাইস (hands free device) ব্যবহার করা আইনগতভাবে বৈধ, কারণ সেক্ষেত্রে চালক দুই হাতে স্টিয়ারিং হুইল ধরে রাখতে পারেন।
গাড়ি চালানো অবস্থায় খুদেবার্তা চালাচালি করা (texting) একটি প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত
গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলাটা বিপদজনক হলেও এক্ষেত্রে তবুও চালক তার দৃষ্টি রাস্তার দিকে নিবদ্ধ রাখতে পারেন। যাহোক, দুর্ঘটনার সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়ে যাচ্ছে সেইসব চালকদের কারনে যারা গাড়ি চালানোর সময় খুদেবার্তা (text message) চালাচালি করে থাকেন। অবশ্যই এ কারনে যে, খুদেবার্তা পাঠাতে হলে তাদেরকে সত্যিকার অর্থেই তাদের দৃষ্টি অল্প সময়ের জন্য হলেও রাস্তা থেকে সরিয়ে নিতে হয় যাতে করে তারা বার্তা টাইপ করতে পারেন। যতক্ষণ ধরে চালক লক্ষ্য রাখছেন না যে, গাড়িটি আদৌ কোনদিকে যাচ্ছে এই সময়টুকুর মধ্যে এমনসব দুর্ঘটনা ঘটেছে যাতে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মানুষকে অযথা প্রাণ হারাতে হয়েছে। কোনো গাড়ি যদি উচ্চ গতিতে ছোটে তবে তা মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই অনেক দূরত্ব পাড়ি দিতে পারবে। এই সময়টুকুতে অন্য কোনো বাহন কিংবা বাইক আরোহীর পক্ষে গাড়ি চালকের অগোচরে গাড়িটির সামনে এসে পড়া বিচিত্র নয়। গাড়ি চালানোর সময় খুদেবার্তা চালাচালি করা থেকে লোকজনকে বিরত রাখতে এই কাজের বিপদ সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে সরকারিভাবে জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিই এই মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে জনগণকে গাড়ি চালানোর সময় খুদেবার্তা চালাচালি করা থেকে বিরত রাখতে স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে বিনা পারিশ্রমিকে টেলিভিশনের জনস্বার্থ সংক্রান্ত ঘোষণা প্রদানে উপস্থিত থেকেছেন।
গাড়ি চালানোর সময় ক্লান্তি
যদিও গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা এমন একটি বিপদজনক কাজ যেটি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রায়ই আলোচনা হয়ে থাকে, কিন্তু এই সংক্রান্ত আরেকটি বিপদজনক ব্যাপার রয়েছে যেটি ততটা প্রচার পায়নি। এই বিপদটি সেইসব ব্যক্তিদের সাথে সংশ্লিষ্ট যারা হয়ত খুবই ক্লান্ত, কিন্তু তারপরেও যেকোনো উপায়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। ঘুমের ঘাটতি, যেটি ক্লান্তি হিসেবে পরিচিত, একটি বড় সমস্যা, কারণ অনেক মানুষ এতটাই ব্যস্ত জীবন যাপন করেন যে তারা তৃপ্তিসহকারে ঘুমাতে পারেন না। যে সব লোক পূর্ণকালীন কাজে নিযুক্ত এবং পাশাপাশি যাদেরকে সন্তানাদির দেখাশুনাও করতে হয় তারা প্রায়ই ক্লান্ত থাকেন। যাহোক, এই ধরনের ব্যক্তিরা যখন কোনো মোটরযানের চালকের আসনে বসার সিদ্ধান্ত নেন তখন তাদের ক্লান্তিজনিত কারনে গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে অন্যদের কিংবা নিজেরই প্রাণসংহার করে ফেলতে পারেন। ক্লান্তিজনিত সমস্যাটি ট্রাক চালকদের মধ্যেই বেশি দেখা যা,য় যাদেরকে বিশ্রাম ছাড়াই একটানা ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রাক চালিয়ে যেতে হয়। ট্রাক চালকগণকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মালামাল পৌঁছে দেয়ার চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়। তাই, তাদের পক্ষে কোথাও থেমে একটু বিশ্রাম করার বিলাসিতাটি ঠিক শোভা পায় না। শরীরে ঘুমের চাহিদা প্রবল হয়ে দেখা দিলে মানুষের শরীর অবশ্যই একপর্যায়ে গিয়ে ভেঙ্গে পড়বে। ট্রাক চালকদের ক্ষেত্রে পথচলতিকালীন এমনটি হয়ে থাকলে তার ট্রাকটি বিপুল ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানিসহ দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে।
কীভাবে এসব ব্যাপার এড়ানো যায়?
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে চলতি পথের অনেক দুর্ঘটনাই কেবলমাত্র সাধারণজ্ঞান ব্যবহার করে এড়ানো সম্ভব। আপনার কাছে যদি নিরাপদে গাড়ি চালানোর পক্ষে নিজেকে খুবই ক্লান্ত লাগে তবে একজন বন্ধু অথবা পারিবারিক সদস্যকে বলুন আপনাকে আপনার গন্তব্যে পৌঁছে দিতে। এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত যা আক্ষরিক অর্থেই আপনার নিজের এবং অন্যদের প্রাণ রক্ষা করতে পারে। আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারেন এমন কোনো বন্ধু অথবা আত্মীয় যদি আশেপাশে না থাকে তবে একটি ট্যাক্সি ডেকে নিন। আপনি কিছুটা বিশ্রাম করে নিতে অথবা আপনার ভ্রমণটি পরবর্তী সুবিধাজনক সময়ের জন্য বিলম্বিতও করতে পারেন।
একইভাবে, গাড়ি চালানোর সময় খুদেবার্তা চালাচালি করা আপনার কোনো প্রয়োজন নেই। এমন আহামরি গুরুত্বপূর্ণ কোনো খুদেবার্তা থাকা সম্ভব নয় যেটি আপনি আপনার গন্তব্যে পৌঁছার পর পাঠালে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। গাড়ি চালানোর সময় কারো সাথে ফোনে যোগাযোগের যদি একান্তই প্রয়োজন হয় তবে আপনার উচিত একটি মুক্তহস্ত ডিভাইস (hands free device) ক্রয় করা যেটি আপনি আপনার ফোনের সাথে সংযুক্ত করতে পারবেন। দেখেশুনে পছন্দ করে নেয়ার মত এ ধরনের অনেক ডিভাইস বিভিন্ন দামে পাওয়া যায়। মুক্তহস্ত ডিভাইস (hands free device) আপনাকে কণ্ঠনির্দেশ (voice commands) ব্যবহার করে ফোনকল পাঠানো বা কল গ্রহণ করার সুবিধা প্রদান করবে। এতে আপনি সব সময়ের জন্য দুই হাতে স্টিয়ারিং হুইল ধরে রাখাতে পারবেন। এভাবে, আপনি আপনার গাড়ির উপর সর্বদাই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবেন। মুক্তহস্ত ডিভাইসগুলো (hands free device) আপনি বেশিরভাগ ইলেক্ট্রনিক্সের দোকানগুলেতে কিনতে পাবেন।

সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

Comments

comments