মাইক্রোম্যাক্স ক্যানভাস ফাইভ: ম্যাচ সেরার জন্যই মাননসই ?

Share

মাইক্রোম্যাক্স বাংলাদেশের স্মার্টফোনের বাজারকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারে। আপাত দৃষ্টিতে তাদের নতুন ক্যানভাস ফাইভ ফোনটিই হচ্ছে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কোম্পানিটি তাদের এই ফোন অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে বাজারে এনেছে। যাতে থাকছে দারুন সব ফিচার এবং অন্যান্য আকর্ষণ। স্মার্টফোন বিক্রির ক্ষেত্রে এটি বাজারে কতটা প্রভাব ফেলবে তা আমরা এখনই বলতে পারবো না। তবে ফোনটি বাজারে কতটা গতি আনছে আমরা সেটি উপর লক্ষ্য রাখছি। নিচে এই ডিভাইসটির সম্পর্কে আলোচনা তুলে ধরা হলো।

ডিজাইন:

মাইক্রোম্যাক্সের ক্যানভাস ফাইভ স্মার্টফোনটি দেখতে অনেকটা ক্যানভাস নিট্রো থ্রি এর মতোই। ক্যানভাস নিট্রো থ্রি সম্পর্কে কিছু দিন আগেই আমরা বিস্তারিত বর্ণনা (পর্যালোচনা) দিয়েছি। তবে মাইক্রোম্যাক্স তাদের নতুন স্মার্টফোনটিকে আরও বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে বাজারে এনেছে। ক্যানভাস ফাইভ এর আধুনিক ব্যাক কাভারটি প্লাস্টিকের তৈরি এবং সহজে খোলা যায়। নিট্রো থ্রি’র মতো ক্যানভাস ফাইভও একইরকম উপকরণ এবং ফ্যাক্স চামরার তৈরি। এতে এটি সুন্দরভাবে ধরা যায় এবং এর উপকরণগুলো অনেক বেশি মজবুত ও টেকসই। আগের ডিভাইসটির (নিট্রো থ্রি) সাথে এই ডিভাইসটির অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে। নতুন এই ডিভাইসটি মেটাল চেসিস এর তৈরি। ফোনের বডি গোলাকৃতির এবং হাতে খুব সহজে ধরা যায়। পাওয়ার এবং ভলিউম এর বাটনগুলোও মেটাল দিয়ে তৈরি করা। তবে এই বাটনগুলো মেটালের তৈরি হলেও সর্বোচ্চ সাফল্যজনকভাবে কাজ করবে তা আমরা বলছি না। এজন্য আমরা সবসময় ক্ষমাপ্রার্থী। বাটনগুলো কাজ করবে কিন্তু যতটা প্রত্যাশা করা হচ্ছে তার চেয়ে কম।

20160307_160452

এই ফোনের ডিসপ্লেটি ২.৫ডি কার্ভড (বাঁকা) গ্লাসের তৈরি। আপনি যদি এই গ্লাসটির সাথে পরিচিত না হয়ে থাকেন, তাহলে গ্যালাক্সি নোট ফোর, আইফোন সিক্স/সিক্স এস অথবা নেক্সাস সিক্স ডিভাইসগুলো দেখে নিতে পারেন। তাহলে গ্লাসটি সম্পর্কে জানতে পারবেন। এই গ্লাসটি মূলত: কিনারের দিকে ধীরে ধীরে সরু হয়ে গেছে, এতে ডিসপ্লেটি দেখতে অনেক বড় দেখায় এবং এর প্রান্তগুলো পাতলা। ফোনটির চারপাশ বাঁকা (কার্ভড) থাকায় ফোনটি দেখতে অনেক চমৎকার লাগে এবং মনে হয় এর ডিসপ্লে ফোনের বডির সামনে গলে পড়েছে।

20160307_154405

এর পেছনের স্পিকারটি প্রয়োজন সাথে তাল মিলিয়ে বেশ ভালোই করা হয়েছে এবং যদিও ব্যাটারিটি খোলা যায় না। এই ফোনটির আরেকটি চমৎকার দিক হচ্ছে, যখন আপনার ফোনে কোন নোটিফিকেশন আসবে অথবা ডিভাইসটি চার্জ হবে তখন ডিসপ্লের উপরের দিকে থাকা ছোট এলইডি লাইটটির মাধ্যমেই আপনি তা জানতে পারবেন।

 

ডিসপ্লে:

20160307_154815

ক্যানভাস ফাইভ সবচেয়ে ভালো করেছে এর ডিসপ্লেটি। মাইক্রোম্যাক্স এই ফোনটিতে ৫.২ ইঞ্চি ফুল এইচডি (১৯২০*১০৮০) আইপিএস প্যানেল প্রোটেকটেড গোরিলা গ্লাস থ্রি ব্যবহার করেছে। প্রতি ইঞ্চিতে ৪২৩ পিক্সেলের মতো উচ্চ ঘনত্বের পিক্সেল ব্যবহার করার কারণে এর ডিসপ্লেটিতে সবকিছুই খুব স্বচ্ছ এবং অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন দেখা যায়। ডিসপ্লেটিতে রংয়ের প্রতিফলন হয় খুব সুন্দর এবং স্ক্রিন রোটেশন করে দেখা যায়। ডিসপ্লের উজ্জ্বলতা অনেক ভালো হওয়ার কারণে বাইরে রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরেও লেখা অনেক ভালো দেখা এবং পড়া যায়।

পারফর্মেন্স বা কার্যক্ষমতা :

ক্যানভাস ফাইভে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাংশন শীট রয়েছে। চমৎকার কার্যক্ষমতা সম্পন্ন এই ডিভাইসটিতে রয়েছে ১.৩ গিগাহার্টজ এর একটি অক্টা-কোর মিডিয়া টেক ৬৭৫৩ প্রসেসর। সাথে রয়েছে ৩ জিবি ডিডিআরথ্রি র‌্যাম এবং একটি ম্যালি টি৭২০এমপিথ্রি জিপিইউ। এই উপকরণ ও ফাংশনের কারণে ক্যানভাস ফাইভ যে অনেক শক্তিশালী এটা বলা এখন নিরাপদ। কারণ এই জায়গায় ক্যানভাস ফাইভ অন্য যে কোন ফোনের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। তবে জিপিইউ’র সমন্বয়ে প্রস্তুতকৃত এইচডি ফুল স্ক্রিন সামান্য খারাপ সেবা দিবে যখন মডার্ন কমব্যাট ফাইভ এর মতো অতি উচ্চ মাত্রার গেইমগুলো খেলা হবে। তবে অ্যাসফাল্ট এইট খুব ভালো ভাবেই এতে কাজ করবে এবং অন্যান্য গেইমগুলোও ভালো চলবে। ফোনটিতে ৩ জিবি র‌্যাম থাকায় এর মেমোরিতে আপনি অনেকগুলো অ্যাপস রাখতে পারবেন এবং একটির পরিবর্তে অন্যটিকে বন্ধ রেখে একইসাথে অনেকগুলো কাজ করতে পারবেন। এটা এই ফোনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।

20160307_154302

২৯০০ এমএএইচ (মিলি অ্যাম্পিয়ার আওয়ার) এর ব্যাটারির মাধ্যমে খুব সহজেই আপনি পুরো একটি দিন অতিবাহিত করতে পারবেন। মোবাইলটির স্ক্রিনের বাইটনেস (উজ্জ্বলতা) যদি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে (কমিয়ে) রাখা যায় তাহলে আপনি এই ডিভাইসটির মাধ্যমে আরও বেশি সময় ধরে কাজ করতে পারবেন বা সেবা নিতে পারবেন। এখানে একটা বিষয় অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন, ক্যানভাস ফাইভ ফোনটি যদি আপনি কোন তৃতীয় পক্ষের চার্জার (নির্ধারিত চার্জার ব্যতিত) ব্যবহার করে চার্জ করতে চান তাহলে এটা খুব ধীরে চার্জ হবে। যখনই আপনি ক্যানভাস ফাইভ ফোনটি চার্জ দেয়ার জন্য নির্ধারিত চার্জারের পরিবর্তে অন্য কোন চার্জার ব্যবহার করবেন, তখনই পপ-আপ (হঠাৎ জ্বলে উঠা লাইট এবং শব্দ) নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আপনাকে সতর্ক করে দেয়া হবে এবং মাইক্রোম্যাক্স তাদের ক্যানভাস ফাইভ ফোনটির সাথে যে চার্জার দিয়েছিল সেই অরিজিনাল চার্জারটি ব্যবহার করার জন্য বলা হবে। ডিভাইসটিতে ১৬ জিবি রোম রয়েছে (এর মধ্যে ১৪.৮৩ জিবি ব্যবহার করা যাবে)। তবে ফোনটিতে চাইলেই মাইক্রো এসডি মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে ৩২ জিবি পর্যন্ত তা বাড়ানো যাবে।
সফটওয়্যার:

Screenshot_2016-03-07-22-57-46 Screenshot_2016-03-07-22-43-57

ক্যানভাস ফাইভ অ্যানড্রয়েড ৫.১ ললিপপ ফোনটি তৈরিতে প্রস্তুতকারকদের কাছে মজুদ থাকা অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়েছে। সঞ্চিত অভিজ্ঞতার বাইরে থাকা একমাত্র উপাদান শুধু হোম স্ক্রিন লঞ্চারটিই। ফোনটির উপাদানের কারণে এটি একটু বেশি ভারী হলেও ব্যবহারকারীরা কোন ধরণের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা লাভ করবে না কিংবা তাদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। ফোনটিতে বেসিক কিছু ফিচার রয়েছে, যেমন এটিতে অ্যানিমেশন ট্রানজিশন পরিবর্তন করার ক্ষমতা রয়েছে। মাইক্রোম্যাক্স ক্যানভাস ফাইভে একটি স্মার্ট সতর্কীকরণ ফাংশন সংযুক্ত করেছে। যখন আপনি আপনার ফোনটির লক স্ক্রিনে টাচ করে পূর্বে থেকেই সিলেক্ট করা কোন অ্যাপ্লিকেশনে প্রবেশ করতে যাবেন, লক স্ক্রিনে কোন লেটার আঁকবেন বা ডিভাইসটিতে ডাবল টাচ করবে তখন ডিভাইসটি সতর্ক করে দিবে। এখানে অ্যাপস রাখার জন্য নির্দিষ্ট কোন অ্যাপস ড্রয়ার নাই। তাই আপনি যদি ফোল্ডার করে অ্যাপসগুলো নির্দিষ্ট কোথাও না রাখেন তাহলে অনেকগুলো অ্যাপসসহ যাবতীয় বিষয়গুলো একসাথে হয়ে বিশৃঙ্খল অবস্থা (নোংরা বা জঞ্জাল) তৈরি হবে। ক্যানভাস ফাইভ ফোনটি অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে এবং সুন্দরভাবে ব্যবহার করা যাবে।

20160307_160428

ক্যামেরা:

মাইক্রোম্যাক্সের ক্যানভাস ফাইভে মূল ক্যামেরায় ১৩ মেগাপিক্সেল সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে। আর এই ফোনের সামনের দিকের ক্যামেরাটিতে (ফ্রন্ট ক্যামেরা) ব্যবহার করা হয়েছে ৫ মেগাপিক্সেল সেন্সর। মজার বিষয় হচ্ছে মূল এবং সামনের দিকের উভয় ক্যামেরাতেই ফ্ল্যাশ মডিউল ব্যবহার করা হয়েছে। শুধুমাত্র অত্যন্ত জরুরী মূহুর্তেই আমরা স্মার্টফোন ফটোগ্রাফির জন্য এই ফ্ল্যাশ ব্যবহার করে জরুরী মূহুর্তে ছবি তুলতে পারি। যারা সেলফি তুলতে পছন্দ করেন তাদের জন্য সামনের দিকের এই ক্যামেরার ফ্ল্যাশের বিষয়টি সত্যই আনন্দের এবং এই ফিচারের জন্য তারা সাধুবাদ জানাতেই পারেন। ক্যামেরায় তোলা ছবির মান সম্পর্কে যদি বলি, তাহলে বলতে হয়, মূল ক্যামেরা দিনের আলোতে খুব ভালো কাজ করে। এটি অনেক দ্রুত লক্ষ্যটিকে ফোকাস করে এবং পরিষ্কার ও ছকছকে ছবি তোলে। ছবি তোলার ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে এই ক্যামেরাতে অতিরিক্ত আলোকসম্পাত হয়। তবে ছবি তোলার সময় একটু সতর্ক থাকলেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

20160307_154350

আলোক সল্পতার রয়েছে এমন পরিবেশেও এই ক্যামেরা দিয়ে খুব ভালো ছবি তোলা যায়। অনেক বেশি আলো রয়েছে এমন স্থানে বা পরিবেশে সামনের দিকের ক্যামেরা দিয়ে সবচেয়ে ভালো ছবি আসে। আলো কম রয়েছে এমন পরিবেশে ছবি তোলার জন্য ফ্লাশের সাহায্য নেয়া যেতে পারে তবে এতে আপনার তোলা ছবি কিছুটা আলোর ঝলসানো আসতে পারে।

IMG_20160307_155929 IMG_20160307_155805 IMG_20160307_155408

উপসংহার:

ক্যানভাস ৫ ডিভাইসটি বিক্রির জন্য প্রধান বিষয় হচ্ছে এর মূল্য। মাত্র ১৪,৪৯০ টাকা মূল্যের এই মোবাইলটি স্মার্টফোনের বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করবে। কারণ মাইক্রোম্যাক্সের অন্যান্য প্রতিযোগীরা এতো অল্পমূল্যে এতো বেশি পরিমান র‌্যাম বা মেটালের তৈরি ফোন দিতে পারবে না। এই একই উপকরণ, ফিচার, ফাংশন নিয়ে কোন মোবাইল বাজারজাত করলে তার মূল্য আরও বেশি হবে। মাইক্রোম্যাক্স এখন স্মার্টফোন বাজারজাত করার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। এজন্য কাস্টমারদের আকৃষ্ট করতে আরও বেশি প্রচেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের স্পন্সর হওয়ার মাধ্যমে কোম্পানিটি ক্রেতা সাধারণের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তবে এটি মানুষকে আকৃষ্ট করা বা প্রভাবিত করার জন্য স্বল্পকালীন প্রচেষ্টা। যে সকল স্মার্টফোন গ্রাহক বেশি টাকা খরচ না করেই সেরা, উন্নত ও অতিরিক্ত ফিচার বা ফাংশনগুলো চান তাদের জন্য আমরা ক্যানভাস ফাইভ ফোনটি কেনার পরামর্শ দিচ্ছি। আমরা সামনের দিকে তাকিয়ে আছি, দেখা যাক আগামী দিনে মাইক্রোম্যাক্স কতটা সাফল্য অজর্ন করতে পারে।

বিক্রয় ডট কমে থাকা মাইক্রোম্যাক্সের অন্যান্য ফোনগুলোও দেখে নিন

ফোনটির বিবরণ:

ডিসপ্লে: ৫.২ ইঞ্চি ফুল এইচডি (১৯২০*১০৮০) আইপিএস গোরিলা গ্লাস থ্রি (৪২৩ পিপিআই)
সিপিইউ: এমটি ৬৭৫৩ ১.৩ গিগাহার্টজ অ্যাক্টা-কোর
জিপিইউ: ম্যালি- টি৭২০
র‌্যাম: ৩ জিবি
রোম: ১৬ জিবি (১৪.৮৩ জিবি ব্যবহারযোগ্য, মাইক্রো এসডি কার্ড এর মাধ্যমে ৩২ জিবি পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যায়
ব্যাটারি: ২৯০০ এমএএই (মিলি অ্যাম্পিয়ার আওয়ার)
ক্যামেরা: মূল্য ক্যামেরা ১৩ মেগাপিক্সেল, সামনের দিকের ক্যামেরা ৫ মেগাপিক্সেল
অপারেশন সিস্টেম: অ্যান্ড্রয়েড ৫.১ ললিপপ
স্ট্যান্ডবাই টাইম: ২৭৫ ঘণ্টা
টকটাইম: ১০ ঘণ্টা
ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড: জিএসএম (৮৫০/৯০০/১৮০০/১৯০০)+ ডব্লিউসিডিএমএ (৯০০/২১০০) এলটিই এফডিডি-৮৫০/১৮০০ মেগাহার্টজ এবং টিডিডি-২৩০০ মেগাহার্টজ
ব্লুটুথ: ভি৪.০

সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

Comments

comments