নারীর পক্ষে দাঁড়াতে হবে পুরুষকে

Share

বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বিশেষ করে পারিবারিক নির্যাতনের হার উদ্বেগজনক। সরকারের জরিপ অনুযায়ী, বিবাহিত ১০ জন নারীর মধ্যে প্রায় নয়জনই স্বামীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার। খাসজমি বিতরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যও। তবে দেশে অনেক ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে, যা এ ধরনের পরিস্থিতি পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। নিশ্চিত করতে হবে বিভিন্ন আইনের প্রয়োগ। একই সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নারী বিশেষ করে পুরুষের সচেতনতাও জরুরি।

আজ বুধবার প্রথম আলো, ইউএন উইমেন এবং সুইডেন দূতাবাস আয়োজিত ‘নারীর পক্ষে পুরুষ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা এসব কথা বলেন। ১৬ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালনের অংশ হিসেবে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল বৈঠকের আলোচক বিশেষ করে পুরুষ আলোচকেরা নিজেদের পরিবারে বাবা, স্বামী বা ভাই হিসেবে নিজেদের পুরুষালি ভূমিকা পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেন। পাশাপাশি যে যাঁর কর্মক্ষেত্রে নিজে কীভাবে আন্তর্জাতিক হি ফর শি বা নারীর পক্ষে পুরুষ ক্যাম্পেইন বা প্রচারাভিযানকে কাজে লাগাবেন তাও উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশে মার্চে ইউএন উইমেনের উদ্যোগে শুরু হওয়া এ প্রচারাভিযানে প্রথম আলো সহযোগী সংস্থা হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

গোলটেবিল বৈঠকে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত জুহান ফ্রিসেল সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে তিনি রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন। নারীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য পুরুষের পক্ষ থেকে দীর্ঘ মেয়াদে অঙ্গীকার থাকা এবং পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে সচেতনতার বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেন তিনি।
বৈঠকে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ও বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ডি ওয়াটকিন্স নারী নির্যাতন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়েকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের খসড়ায় বিশেষ শর্ত বা বিধান দিয়ে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ থেকে ১৬ বছর করার যে প্রক্রিয়া চলছে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
রবার্ট ডি ওয়াটকিন্স আরও বলেন, দাতা সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের মন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে লবি চালানো হচ্ছে, যাতে কোনো ভাবেই মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানো না হয়। যেহেতু আইনটি খসড়া আকারে আছে, আশা করি আইনটি চূড়ান্ত করার আগে সরকার অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। তিনি নারীর ন্যায়বিচার পাওয়া নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

ইউএন উইমেনের এ দেশীয় প্রতিনিধি ক্রিস্টিন হান্টার বাংলাদেশে পারিবারিক নির্যাতনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে উদ্বেগ জানান। ঘরের মধ্যে স্বামী, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, সহপাঠীদের মাধ্যমে যৌন নির্যাতন, কর্মক্ষেত্র, রাস্তা ও স্কুলসহ বিভিন্ন জায়গায় যে কায়দায় পুরুষেরা নির্যাতন চালাচ্ছে তা কীভাবে করা সম্ভব তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। নির্যাতনকে নারীর মানবাধিকারের লঙ্ঘন উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীর মৌলিক অধিকার নেই বলেই তাঁরা প্রতিনিয়ত এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

ক্রিস্টিন হান্টার বলেন, সমাজে পরিবর্তন আনা কঠিন। তবে পরিবর্তন আনতেই হবে। অনেক পুরুষ নারীকে নির্যাতন করছে না। পরিবর্তন আনতে হলে আন্দোলনে পুরুষের অংশগ্রহণ জরুরি। একই ভাবে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এ দেশীয় পরিচালক শ্রীনিভাস বি রেড্ডি কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পোশাকশিল্পে ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক কর্মরত। তবে বেশির ভাগ নারী শ্রমিক কম বেতনের কাজগুলোর সঙ্গে যুক্ত। তাদের দক্ষতাও কম। এ ছাড়া নেতৃত্বের জায়গাটাও ধরে রেখেছে পুরুষ। সবাইকে মনে রাখতে হবে, যেখানে নারীদের ভূমিকাটা বড় সেই জায়গায় নারীদের কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি শহিদ উল্লাহ আজিমও স্বীকার করে বলেন, পোশাকশিল্পে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, তবে নেতৃত্বে ততটা আসতে পারেনি। মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনা পর্যায়েও সংখ্যাটি কম। তবে আগে মেয়েদের একটু বয়স হলেই অভিভাবকেরা বিয়ে দিয়ে দিতেন। কিন্তু এখন মেয়েরা শহরে এসে পোশাকশিল্পে কাজ করছেন। পরিবারে একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছেন। সন্তানের লেখাপড়াসহ বিভিন্ন বিষয়েই তাঁরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ এবং দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

গণমাধ্যমে নারীকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, চিরাচরিত সেই ধ্যানধারণা থেকে বের হয়ে আসার কথা বলেন অভিনেতা ইরেশ যাকের। তিনি বলেন, নাটক ও তথ্যচিত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নারীকে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন এবং ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিভিন্ন ভাবে পরিবর্তন আনা উচিত। এ ছাড়াও ব্যক্তি জীবনে সবাইকে মা, বোন, স্ত্রী অর্থাৎ নারীর পাশে দাঁড়ানো উচিত।

ইনসিডিন বাংলাদেশের অ্যাডভোকেসি প্রধান নাসিমুল আহসান বলেন, খাস জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিধবা নারীর সক্ষম পুত্র থাকলেই তাদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। অথচ মেয়ে সন্তান থাকলে জমি পাওয়া যাবে না বলে নীতিতেই উল্লেখ আছে। এসএমই ফাউন্ডেশনে ৭০ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে পুরুষ উদ্যোক্তাদের পেছনে। তিনি এ ধরনের বৈষম্যকে ‘সিস্টেমেটিক বৈষম্য’ হিসেবে উল্লেখ করে তা পরিবর্তনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন। এ ধরনের বৈষম্য নিরসনের বিষয়টি সাংসদেরা যাতে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন সে আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এ দেশীয় সহকারী পরিচালক পলাশ কান্তি দাশ বলেন, একদিকে পোশাকশিল্পে নারীর অংশগ্রহণের ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। মানব উন্নয়ন সূচকেও দেশের অবস্থান ভালো। অথচ নারী নির্যাতন বেড়েই চলছে। বর্তমানে গ্রাম এবং শহরে নারী নির্যাতনের ধরনও পাল্টাচ্ছে। একদিকে উন্নয়ন, অন্যদিকে নির্যাতন বৃদ্ধি বা নির্যাতনের ধরন নিয়ে তেমন একটা গবেষণা হচ্ছে না। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে এ ধরনের গবেষণা থাকা জরুরি।

বিক্রয় ডট কমের পরিচালক (বিপণন) মিশা আলী বলেন, পুরুষ নিজে তাঁর আচরণ পরিবর্তন করে না। আশা করে নারীরা তাঁদের আচরণ পরিবর্তন করবেন। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষে সমতা তৈরির জন্য যাতায়াতে গাড়ির ব্যবস্থা করা, নতুন কর্মীদের জন্য জেন্ডার বিষয়ক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বাড়ানোর জন্য অন্যান্য প্রশিক্ষণসহ যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা উল্লেখ করেন।

জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভী রাখসান্দ মনে করেন, নারী-পুরুষে সমতা তৈরিতে শিক্ষার বিষয়টি অপরিহার্য। নারী-পুরুষে সমতা তৈরিই যথেষ্ট নয়, সাম্য বা ইক্যুইটি প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম এবং আনিসুল হক জেন্ডার বৈষম্য নিরসনে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে নীতিমালা তৈরিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন। আব্দুল কাইয়ুম নারী নির্যাতন প্রতিরোধে দেশে অনেক আইন থাকলেও তার বাস্তবায়নে সমস্যার কথা উল্লেখ করে আইনের যথাযথ প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন।

আনিসুল হক পরিবারের ভেতরে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ পরিসংখ্যান উল্লেখ করে নিজে একজন পুরুষ হিসেবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি তাঁর লেখনীসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে জেন্ডার বৈষম্য নিরসনে ভূমিকা রাখবেন বলে অঙ্গীকার করেন।

Arifin Hussain Administrator
Passionate online marketer and tech blogger. Currently working at Bikroy.com as Online Marketing Specialist. , Bikroy.com
follow me
সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

Comments

comments