একটি স্বাস্থ্যসম্মত এবং পরিচ্ছন্ন রান্নাঘর 

Share

প্রত্যেক  বাসায় একটি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রান্নাঘর থাকা প্রয়োজন কারণ একটি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রান্নাঘর খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং পরিবারের সদস্যদের রোগাক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচায়। রান্নাঘর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা তেমন কষ্টের কাজ নয়। শুধুমাত্র একটু মনযোগী হলেই হয় এবং যিনি রান্নাঘর ব্যবহার করবেন তিনি আপনি যেভাবে চান সেভাবে এটার মান বজায় বজায় রাখলেই হয়।

এই টিপস গুলো আপনাকে রান্নাঘর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে সাহায্য করবেঃ

১. রান্নাঘরে কিছু করার আগে সব সময় নিজের হাত ধুয়ে নিতে হবে। আপনার হাতের আংটি এবং ঘড়ি খুলে ফেলতে হবে কারণ ব্যাকটেরিয়া আংটি এবং ঘড়ির মধ্যে থেকে গেলে তা খাবারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আপনি যদি রান্নাঘরে কারো সাহায্য নেন তবে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে সে যেন নিয়মগুলো মেনে চলে। আপনি তাদের সাবান এবং একটি টাওয়েল প্রদান করে এই কাজটি আরো সহজ করতে পারেন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ তারা হাত দিয়েই উপাদানগুলো মিশাতে খুব পছন্দ করবে।কিছু ক্ষেত্রে পরে হাত ধোয়াটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণঃ

  •  মাছ অথবা মাংস ধরার পর এবং সবজি কাটা শুরু করার আগে।
  • হাঁছি, হাই এবং কাশি আসলে আপনাকে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলতে হয় অথবা নাক পরিস্কার করতে হয়।
  • চুল ঠিক রাখতেও আপনার হাত ব্যবহার করেন।
  •  খাবারের স্বাদ নিতে হাত ব্যবহার করেন।

২. যিনিই রান্নাঘরে কাজ করুক না কেন তাকে নিয়মিত ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। চুল সবসময় পিছনের দিকে বেঁধে রাখতে হবে এবং যথোচিত কাপড় পরিধান করতে হবে যাতে এটি খাবারে মধ্যে না পড়ে। নখ ছোট এবং পরিস্কার রাখা উচিত।

 ৩ . রান্নাঘরে কোন অনিষ্ট ঘটে গেলে ঝটপট এটির যতœ নিতে হবে। যদি আঙুল কেটে যায় তবে রক্ত বন্ধ করতে অনেক সময় লাগবে। তাই আবার খাবার স্পর্শ করার পূর্বে এর জন্যে যথাযথ যতœ ও ব্যান্ডেজ নিশ্চিত করতে হবে। যদি খাদ্যে রক্ত পড়ে তবে তা বাদ দিতে হবে এবং যে স্থানে রক্তাক্ত হয়েছে সেটিকে সংক্রামক জীবাণুনাশক দিয়ে পরিস্কার করতে হবে।

৪. যদি আপনি ঠান্ডা, বমি, ডায়েরিয়া অথবা জ্বরে আক্রান্ত হন তবে আপনার রান্না থেকে বিরত থাকায় ভালো। কারণ এতে আপনার অসুস্থতা পরিবারের সকলের মধ্যে সহজে ছড়িয়ে পড়বে।

৫. মাইক্রো ওভেন, রিফ্রেজারেটরসহ বাসার সকল আসবাবপত্র নিয়মিত পরিস্কার করতে হবে। যখন হাতল এবং টেপে কালো লাইন অথবা চিহ্ন দেখতে পাবেন তখন বুঝবেন ফাঙ্গাস এবং ছত্রাক জন্মাতে শুরু করেছে। যখন আপনি খাবার রাখেন তখন আপনার রেফ্রিজারেটর এবং মাইক্রো ওভেনের ভিতর এবং বাহির উভয় পাশ ভালো করে পরিস্কার করতে হবে তা না হলে জীবাণু দিগুন হারে বাড়তে শুরু করবে।

৬. চুলার উপরে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। এই জায়গা খাবার দিয়ে খুব তাড়াতিাড়ি ঢেকে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে সবচেয়ে ময়লাযুক্ত জায়গা হল চুলার উপরের অংশটা। খাবার শুকনো এবং পরিস্কার না থাকলে ব্যাকটেরিয়ায় জন্ম নেয় এবং এটি তেলাপোকা, ইঁদুরসহ  বিভিন্ন পোকামাকড়কে আকৃষ্ট করে। পোকামাকড় এবং ইঁদুর সেখানে মলত্যাগের কারণে এগুলো আপনার পরিবারের জন্যে বেশি ক্ষতিকর বস্তুতে পরিণত হয়।

দিন শেষে চুলার চারপাশে যাতে কোন খাবার পড়ে না থাকে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।  সামান্য পরিমাণ খাবারও অবশিষ্ট নেই এটা আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে।

  • ছাদের  নীচে
  • মেঝেতে
  • রান্নার সরঞ্জামগুলোর উপরে এবং পিছনে
  • সিংকের ভেতর
  • ডাইনিং টেবিলের উপর

৭. প্রতিদিন কাজের শেষে হাতের গামছা, স্পঞ্জ, ব্রাশ এবং অন্য সকল পরিস্কারক কাপড় ধুয়ে দিতে হবে এবং শুকাতে হবে। এটি গুরুত্বপূর্ণ যে এসব বস্তুগুলো ভেজা রাখা যাবে না কারণ জীবাণু এতে জীবন্ত থাকতে পারে। যখন এগুলো ভালোভাবে শুকিয়ে যাবে তখন সকল জীবাণু মারা যাবে এবং আপনি পরদিন ব্যবহারের জন্যে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন গামছা পাবেন।

৮. দোকান থেকে ফল এবং সবজি আনার পর নির্দিষ্ট স্থানে রাখার আগে অবশ্যই ধুয়ে ফেলতে হবে। যদি এগুলো ভালো স্থান থেকে আনা হয় এবং পরিস্কার দেখা যায় তারপরও। যেকোন ধরনের কেমিক্যাল এবং জীবাণু দূর করতে উত্তম কাজ হবে অবিষাক্ত সাবান, সিন্থেটিক ভিনেগার, পানি অথবা লবন পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

৯. পরে খাবার জন্যে রাখা সব ধরনের খাবার অবশ্যই রেফ্রিজারেটরে রাখতে হবে। মাংস জাতীয় খাবার দুই দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। সবজি ও ডাল জাতীয় খাবার চার দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। যদি বিদ্যুত বিভ্রাট থাকে তবে যেকোন রান্না করা খাবার ফেলে দিতে হবে।

১০. যদি আপনি একসাথে রান্না করে কয়েক দিনের জন্যে খাবার রাখতে চান তবে ভালো হবে রান্না করা খাবার ঠান্ডা করে সিঙ্গেল পাত্রে রেখে ফ্রিজে রেখে দিতে হবে। এইক্ষেত্রে আপনি আপনার প্রয়োজনীয় পরিমাণ বের করবেন এবং একসাথে সম্পূর্ণ খাবার গরম করে পুনরায় এটিকে ফ্রিজে রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে খাদ্যে বিদ্যামান পুষ্টি নষ্ট হবে।

১১. সবসময় মেয়াদ-কাল দেখে খেতে হবে, মেয়াদকাল শেষ হওয়া খাবার কখনো খাওয়া যাবে না। এটি বিশেষত দুধ, মাংস, মুরগি এবং মাছের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো অতি পচনশীল এবং খুব তাড়াতাড়ি মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দুষিত হয়ে যায়।

১২. সব সময় রান্না করা খাবার এবং কাঁচা মাংস আবরণযুক্ত পাত্রে রাখতে হবে। এতে এসব খাবার ফ্রিজে থাকা অন্যান্য কাঁচা খাবারের মাধ্যমে দূষিত হওয়া থেকে মুক্ত থাকবে। রিফ্রেজারেটর সব সময় পরিস্কার এবং গোছালো রাখতে হবে।

১৩. চাল, ডাল এবং সীম ব্যবহারের আগে প্রায় আধ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এতে এগুলোতে মিশ্রিত রং, কেমিক্যাল এবং কিটনাশক ধুয়ে যাবে।

১৪. যে কাটিং বোর্ড দিয়ে মাছ, মাংস এবং মুরগি কাটা হয় ঐ কাটিং বোর্ড দিয়ে কোনভাবে ফল এবং সবজি কাটা যাবে না। এগুলো কাটার পর যথাযথ পরিস্কার পরই ঐ বোর্ডে অন্যসব কিছু কাটা যাবে।

১৫. প্রত্যেক বেলা খাবারের পর রান্নার এবং খাবারের কাজে ব্যবহৃত সকল উপকরণ ভালোভাবে পরিস্কার করতে হবে এবং এমন স্থানে রাখতে হবে যাতে এগুলো শুকাতে পারে। যদি এগুলো ভেজা থাকে তবে আদ্রতার কারণে এগুলোতে ফাঙ্গাস এবং ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে। যখন সম্ভব হবে তখন এগুলোকে গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে যাতে তৈলাক্ততা দূর হবে।

১৬. রান্নার সময় খাবেন না। এটি শুধুমাত্র আপনার অস্বাস্থ্যকরই নয় বরং নিয়মিত যথা সময়ে খাবার খাওয়া অনেক স্বাস্থ্যকর, কিন্তু  এতে  আপনার খাদ্যে জীবানু আক্রমন করতে পারে।।

১৭. ময়লাযুক্ত ডিস রাতে কখনো রান্নাঘরে ফেলে রাখা যাবে না। কারণ রাতের বেলায় এগুলোতে তেলাপোকাসহ অন্যান্য পোকামাকড় মুখ দিতে পারে। দিন শুরু করার সময় অবশ্যই রান্নাঘরের সকল ময়লা দূর করতে হবে।

১৮. মাসে এক অথবা দুইবার ব্যাপকভাবে রান্নাঘর পরিস্কার করতে হবে। খালি আলমারি এবং পুরাতন জিনিসপত্র ফেলে দিতে হবে। পিপড়া এবং অন্যান্য পোকামাকড় দূর করার জন্যে আলমারির ভিতরের অংশ এবং ড্রয়ার জীবানুনাশক দিয়ে পরিস্কার করতে হবে।

রান্নাঘরে, পরিস্কারক গামছা এবং স্পঞ্জ এ দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া আপনার হাতের মাধ্যমে একস্থান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তরিত হতে পারে তাই খাবার রান্না করার আগে এবং পরে সবকিছু পরিস্কার রাখা খুব জরুরি। দিন শেষে এটিকে পরিস্কার করতে হবে এবং শুকানোর সময় দিতে হবে। রান্নাঘরে গামছা ব্যবহার করাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

Comments

comments