Bikroy

‘I Love Bangladesh’ গল্প প্রতিযোগিতার ৫টি বিজয়ী গল্প

দেশপ্রেম ও বীরত্বের অজানা উপাখ্যান

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মার্কেটপ্লেস Bikroy.com আয়োজিত বিজয় দিবস উপলক্ষে ‘I Love Bangladesh’ Powered by CycleLife Exclusive গল্প প্রতিযোগিতায় ২৫০ এরও বেশি সংগৃহীত গল্পগুলো থেকে সেরা পাঁচটি গল্প বাছাই করে লেখদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছেন মিনতি অধিকারী, দ্বিতীয় হয়েছেন মোহাম্মদ শাকিল আহমেদ, তৃতীয় হয়েছেন মোঃ আহাদ বিন ইসমাইল , চতুর্থ হয়েছেন মুহাম্মাদ আলতামিশ নাবিল এবং পঞ্চম হয়েছেন সুমাইয়া সুলতানা সিফা। গত ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৯-তে Bikroy.com এর হেড অফিসে আয়োজিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং তাঁদেরকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হয়। বিজয়ীদের এসব গল্পে উঠে এসেছে সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ আর বীরত্বের উপাখ্যান। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে এবার তুলে ধরা হলো বিজয়ীদের সেসকল গল্পঃ

১। একজন লাল মিঞা

মিনতি অধিকারী

কি করেছ কী তোমরা? এইটুকু ছেলে, নাবালক যে, একে এনলিস্ট করেছ ট্রেনিং এর জন্য? –একদম নাছোরবান্দা কমান্ডার সাব। বহুত বুঝিয়েছি, কথা শোনে না। –কথা শোনে না বললে তো চলবে না। ইমোশনালি বহু ছেলে দলে ভিড়ে যায়, যুদ্ধের ভয়াবহতা তো ঐটুকু ছেলে বোঝে না। কই ডাকো তো দেখি ওকে, বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়ি পাঠাতে পারি কিনা। দু এক দিনের মধ্যে আমাদের একটি দল ওদিকে যাবে অপারেশানে। মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি- বাঁশিতে সুর তুলতে তুলতে ছেলেটি ঘরে ঢোকে। বয়স বড়জোর বারো-তেরো।

–এই ছেলেটির নাম ই খাতায় তোলা হয়েছে? কিন্তু এর বয়স তো দেখছি আরো কম, বারো কি তেরো। ছেলেটি বাঁশিটি হাতে নিয়েই মিলিটারি কায়দায় সেলুট দেয় কমান্ডারকে। -না, জনাব, আমার বয়স পনেরা কি ষোল। ক্লাস এইটে পড়ি, ইস্কুলের নাম মাটিফাটা হাই স্কুল। বাংলা তেষট্টি সনে যেসুম মোদের গ্রামে পরথম টর্ণাডো আইলো, মানুষজন, গাছপালা, বাড়িঘর সব উড়াইয়া নিল, আম্মাজান কইছেন সেইসুম আমার জনম। আকাশ টকটকা লাল বরন হইয়ে যায়, মা আমার নাম রাখেন লালমিঞা। –বাহ্ বেশ কথা বলো তো তুমি, বাঁশিও তো খুব ভালো বাজাও। কোথায় শিখলে? — আমি নিজে নিজেই শিখছি জনাব। মোদের গ্রামের গহর চাচা বাশি বানায়ে ফিরি করে হাটে গঞ্জে। এক হাটবারে চাচাজানরে না দেখে চাচার বাড়ি যাই, দেখি চাচার ধুম জ্বর। বাঁশি আমিই বিক্রি করি ঘুরে ঘুরে। চাচা আমারে একটা বাঁশি দেন খুশি মনে। এখন আমি নিজেই বাঁশিতে সুর তুলি। স্বাধীন বাংলার সব গান আমি জানি। জানেন জনাব, গহর চাচারে মাইরে ফালাইছে মিলিটারি গঞ্জের হাটে। –কিন্তু লালমিঞা এটা তো যুদ্ধ, জীবন মরণ সমস্যা এখানে। আর তুমি এতো দুর্বল! –না না জনাব, মোটে দুর্বল না আমি। দেখতেই এমন। ইস্কুলে খেলাধূলা প্রতিযোগীতায় দৌড়ে প্রথম হই, লংজাম্পে দ্বিতীয়। ঘরে মেডেল আছে। — তা বাড়িতে তোমার বাবা মা আছেন? তাঁরা জানেন তুমি যুদ্ধে এসেছ? জানতে চান কমান্ডার আব্দুর রহমান। –বাবা নাই জনাব, ছোটবেলায় মারা যান, তার মুখ আমার ভালো করে মনে নাই। মা আছেন, জানেন জনাব আমার মা খুব ভালো রান্ধেন। যেদিন মারে ছেড়ে আসব সেদিন মা সরষে বাটা দিয়ে ডুমুরের ঝাল রেধেছিল, কি স্বোয়াদ, এখনো মুখে লাগি আছে। তবে মা জানেন না আমি যুদ্ধে আছি। –ঠিক আছে আজ আমি তোমার বাশিঁতে স্বাধীন বাংলা বেতারের গানের সুর শুনব। কাল তুমি তোমার মায়ের কাছে ফিরে যাবে। — না জনাব আমি যুদ্ধে যাব, বন্দুক দিয়ে হার্মাদ মারব। মোদের আশেপাশের গ্রাম আর্মি আর রাজাকাররা এটাক করেছে জনাব, আগুন জ্বালায়ে দিছে। কিছু মানুষ পালায়ে মোদের গ্রামে আইছে, বেশির ভাগই মারা পরছে। মেয়েগো ধইরা নিছে। রজবালী রাজাকার আমার দুই ক্লাশ উপরে পরে। ওর চপ্পলে এখন জোর শব্দ জনাব। ও কইছে শির শির কর্নঝোরা মিলিটারি আসবো। আর তখন পন্ডিতমশাইর বাড়ি অর হইবো। এবার কেঁদে ফেলে লালমিঞা, প্রত্যেক পূজায় দিদি আমারে নাড়ু, মোয়া খেতে দেয়। আমারে বাড়ি পাঠাবেন না। কান্নার জোরে টিকে যায় লাল মিঞা। চার দিন পর ওদের দলকে পাঠানো হয় তুরা অস্থায়ী ট্রেনিং ক্যাম্পে। এক মাস ট্রেনিং নেয় লালমিঞা। দিনের বেলা ট্রেনিং নেয় রাতে শুয়ে গল্প করে লালমিঞা ওর চেয়ে খানিকটা বড় অমৃতের সাথে যে ওকে আদর করে ডাকতো লাল্লু। –তা মুক্তিযুদ্ধের কথা জানলে কি করে, খবর পেলে কার কাছে? জানতে চায় অমৃত এক রাতে। –ছক্কুমিঞার কাছে। –ছক্কুমিঞা? –ক্যান শোনো নাই, ’এহন বাংলাদেশের বাইষ্যাকাল। যম বইষ্যা নামছে কয়দিন ধইর‍্যা। এমন বাইষ্যা পাকিস্তানি মিলিটারি বাপের জম্মে দেহে নাই। বিলের পানিতে পইর‍্যা মিলিটারি এহন কাতলা মাছের মতন কোৎ কোৎ করতাছে আর আমাগো বীর মুক্তিযোদ্ধারা পোলো দিয়া খপাৎ কইরা ধরতাছে’। হি হি। মজার চোটে হেসে ফেলে লালমিঞা। সেদিন ছক্কুমিয়ার মুখেই শোনলাম হানাদার আসতাছে আমাগো অঞ্চলে। জনা আশির মত জুয়ান মানুষ জড়ো হইলো যুদ্ধে যাবার জন্য। আমি রাইতে মার পাশে শুইয়ে গলা ধইরে কলাম, আম্মা মুই যুদ্ধে যাবো। ’তুই যুদ্ধে যাবি কিরে বাপ, তুই তো একটা মশা ইস্তক মাইরতে জানোস না। মুই মারে কলাম, মশা মাইরতে না পারি হার্মাদ মাইরতে পারব। মা জোরে আমারে বুকে চাইপ্যে ধইরে কইলো, যাইছনা, আমারে ছাইড়ে যাইস না বাপ।

–তারপর, তারপর কি হল লালমিঞা। আমি জানতে চাই ওর কাছে। দেখি ব্যাথায় নীল হয়ে যাচ্ছে, কুকরে যাচ্ছে লালমিঞার দেহ। যুদ্ধকালীন কিছু স্প্রিন্টার এখনো রয়ে গেছে লালমিঞার শরীরে। মাঝে মাঝেই সেগুলো জানান দেয় তাদের উপস্থিতি। –সেইদিন রাতেই আমরা বর্ডার পার হইয়ে প্রথমে পুরাকাদিয়া তারপর ধালু ক্যাম্পে যাই। তুরা সেন্টারে ট্রেনিং নিয়ে অপারেশনে নামি। বেশ কয়েকটা অপারেশনেই আমরা জিতে যাই। জানেন ম্যাডাম, আমার আর অমের্তদার বয়স ছিলো কম, মরনের ভয় তখনো তেমন মনে বাশা বান্ধে নাই।অপারেশনে নাইম্যাই লাফাইতে লাফাইতে হক্কলের আগে চইল্যা যাইতাম। একটু ভেবে আবার শুরু করে লালমিঞা ––একটা অপারেশনে রাইতের বেলা আর্মি ক্যাম্প আক্রমন করতে কান্ধে রাইফেল নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে আগাইতেছি। অমের্তদা হঠাৎ জোরে চলতে শুরু করলো । সবাই কইলো আস্তে অমের্ত আস্তে। দাদা কইলো, লালু আমারে থামাইসনা। অরা আমার মারে বেয়নেট দিয়া খুঁচিয়ে মেরেছে আমার খবর জানার জন্য। বাবাকে কুটার পালায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে।্ বাবার চিৎকার এখনো শুনি- পালা অমৃত পালা। আরতি, আমার বোন, শুনেছি এই ক্যম্পেই আছে। কমান্ডারের নেতৃত্বে গোলাগুলি শুরু হল। ক্যাম্পে আগুন ধরে গেল। কমান্ডার আমাদের ফিরতে নির্দেশ দিলেন।ফিরতে গিয়ে দেখি অমের্তদা পড়ে আছে। অন্ধকারে গায়ে হাত দিয়ে দেখি শরীর রক্তে ভিজা। আমাগো উপর নির্দেশ ছিল, সহযোদ্ধা কেউ আহত হলে তাকে ফেলে আসা যাবে না। আমি অমের্তদারে পিঠে ফেলে হামাগুড়ি দিতে দিতে এক সময় ক্যাম্পে ফিরে আসি। টের পাই আমার পায়ে গুলি লেগেছে। সেদিন দুজনের রক্ত এক হয়ে ভিজে গেল আমার শরীর। —-তোমার মার কথা মনে পড়ত না? জানতে চাই। –পায়ের ঘাঁ শুকাইতেই আবার অপারেশনে গেলাম। পাশেই আমাদের গাঁও। ভাবলাম মারে একবার দেখে আসি। একদিন মাগরিবের আগে আগে বাড়ির পিছনে করমচা গাছের ঝোঁপের আড়ালে চুপ করে খাড়ায়ে রইলাম। আম্মা কুয়ার পানিতে অজু কইরে বারান্দায় নামাজে বসলেন। আম্মা যেন আরো বুড়া হইয়ে গেছেন, নুয়ে পড়ছেন সামনের দিকে। দরও থেইকে মাকে সালাম জানিয়ে চলে এলাম। –যুদ্ধ শেষে মাকে দেখতে পেয়েছিলে? –পাইছিলাম, লাল-সবুজের নিশান মার হাতে দিয়ে মারে কদমবুচি করলাম।

লালমিঞা ঢাকা মেডিকেল কলেজের চতুর্থশ্রেনীর কর্মচারী। আমি বিভাগীয় প্রধান থাকাকালীন আমার ঘরের যাবতীয় কাজ ওকেই করতে হত। বিবেকের দংশন অনুভব করতাম, লালমিঞা, অমৃতরা ছিল বলেই আজ আমি বিভাগীয় প্রধান। মাঝে মাঝেই ওকে একথা জানাতাম। ও হাসি মুখে আমার ঘরের আসবাব মুছতে মুছতে বলত, মুক্তিযোদ্ধারা কিছু পাবার আশায় তো যুদ্ধ করেনাই। আমি আইজ আপনার ঘর পরিস্কার করি, টেবিল মুছি, এটাওতো দেশসেবাই। ফাঁকিতো দেইনা। আমার কোনো দুঃখ নাই ম্যাডাম। মনেমনে লালমিঞাকে সালাম জানিয়ে বলি, মানুষ যে অমৃতের পুত্র তোমাকে দেখলে বুঝতে পারি লালমিঞা।

২। আলো ছাড়া নক্ষত্র

মোহাম্মদ শাকিল আহমেদ

গ্রামের নাম খৈলসিন্দুর। টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত অত্যন্ত অবহেলিত একটি গ্রাম। গ্রামের মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা বয়ে চলেছে। আশেপাশের গ্রামগুলোতে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও এই গ্রামটিতে এখনো কোন উন্নয়নের হাওয়া লাগেনি। উন্নয়নের দিক দিয়ে যেমন গ্রামটি অবহেলিত তেমনি অবহেলিত গ্রামের মানুষগুলোও। তেমনি এক অবহেলিত মানুষ হলো খালেক চাচা।

খালেক চাচা। বয়স মোটামুটি সত্তর কিংবা আশির মাঝমাঝি। গ্রামের মধ্যে একজন বয়োজষ্ঠ্য ব্যক্তি।দেখতে বৃদ্ধ মনে হলেও মনোবল অনেক দৃড়। বাস করেন জীর্ণ একটি টিনের চৌচালা ঘরে। চাচার বাড়ি আর আমার বাড়ি একই গ্রামে। আমার বাবা ও চাচা ছিল দুই বন্ধু। সেই সুবাদে পরিচয়। আমি জানতাম না চাচা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

কলেজে থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে একটি অ্যাসাইনমেন্টের দেওয়া হয়। অ্যাসাইনমেন্টের বিষয় ছিল এরকম- কার গ্রামে কয়জন মুক্তিযুদ্ধা আছে তা খোজে বের করা এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনা।

অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করতে আমি আমার গ্রামে চলে গেলাম। আমি জানতাম না আমার গ্রামে কয়জন মুক্তি যোদ্ধা আছে। তাই আমি আৃার বাবার সাহা্য্য নিলাম। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম আমাদের গ্রামে কয়জন মুক্তি যোদ্ধা আছে? বাবা বললেন এ বিষয়ে তোমার খালেক চাচা ভাল বলতে পারবে। আমি বললাম,” কেন”? বাবা বললেন তোমার খালেক চাচাও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমি শুনে অবাক হয়ে গেলাম।

আমিতো খুশিতে আত্মহারা। কারণ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মুখ থেকে তার অভিজ্ঞতার কথা শুনব এর থেকে আনন্দের বিষয় আর কি হতে পারে। পরের দিন সকালে চলে গেলাম খালেক চাচার বাড়িতে। তাদের বাড়িতে যেতেই তাদের দূর অবস্থার চিত্র দেখতে পেলাম। বাড়িতে যাওয়ার পর শুনতে পেলাম চাচা অসুস্থ। চাচার ঘরে ঢুকে দেখলাম চাচা বিছানায় শুয়ে আছেন। আমাকে দেখে চাচা উঠে বসলেন এবং আমাকে বসতে বললেন। চাচার সাথে সৌজন্য বিনিময় করার পর তাকে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা বলতে বললাম। একথা শুনে চাচা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কারণ মুক্তিযুদ্ধে চাচা তার বাবাকে ও বোনকে হারিয়েছে।

১৯৭১ সাল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ঢাকাসহ সারা দেশে আক্রমণ শুরু করলো তখন আমাদের টাংগাইল জেলাও আর বাকি রইলো না। ঢাকার অতি নিকটবর্তী হওয়াই অন্যান্য জেলার আগেই আমাদের টাংগাইল জেলার বিভিন্ন গ্রামে পাকিস্তানিরা ঘাঁটি স্থাপন করে। যদিও আমাদের গ্রামে একটু পরেই আসে। চাচা বললেন ‘ সম্ভবত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তারা আমাদপর গ্রামপ এসে ঘাঁটি স্থাপন করে “।

গ্রামে ঘাঁটি স্থাপন করার পরপরই তারা গ্রামের মানুষের উপর অত্যাচার,বিভিন্ন বাড়িতে লুট ও গ্রামের মেয়েদের ধরে নিয়ে ধর্ষণ শুরু করে। খালেক চাচা বললেন এগুলো দেখে সহ্য করতে না পেরে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। খালেক চাচা তাঁর এ সিদ্ধান্তের কথা তাঁর মা-বাবা ও কয়েকজন বন্ধুকে জানালেন। তার বাবা মা তাঁর এ সিদ্ধান্তে সম্মতি প্রকাশ করলেন। তাঁর কয়েকজন বন্ধু রাজি হলেন আর কয়েকজন রাজি হলেন না। যে কয়েকজন রাজি হলেন তাদেরকে নিয়েই তিনি টাংগাইলের কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দিলেন। তাদেরকে প্রশিক্ষণের জন্য ভারত পাঠানো হলো। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁরা বাংলাদেশে চলে আসেন। বাংলাদেশে ফিরে তারা হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে গেরিলা আক্রমণ শুরু করলো।

খালেক চাচা সেই ভয়ংকর দিনগুলোর কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। খালেক চাচা বললেন, “কত রাত যে বাবা না ঘুমিয়ে, না খেয়ে কাটিয়েছি তার ঠিক নাই”। যখন মনে হতো আমাদের এই কষ্টের বিনিময়েই স্বাধীনতা অর্জিত হবে তখন আর কিছু মনে হতো না। বরং আমাদের মনোবল আরো বেড়ে যেত।

একবার মনে আছে যখন আমরা মধুপুরের হানাদার বাহিনীর একটি ঘাটিতে আক্রমণ করতে যায় তখন একটি বাড়িতে আমরা আশ্রয় নেয়। বাড়ির মানুষ প্রথমে ভয় পেলেও পরে যখন জানতে পারলো আমরা মুক্তিবাহিনী তখন তাদের আর আপ্যায়ন দেখে কে?সেই অপারেশনে আমরা সফল হয়েছিলাম। আমাদের এক সহযোদ্ধাও শহীদ হয়েছিলেন।

চাচা বললেন দীর্ঘ প্রায় নয় মাস যুদ্ধের পর যখন দেশ স্বাধীন হলো তখন আমরা যার যার বাড়িতে চলে গেলাম। আমিও আমার গ্রামের বাড়িতে চলে এলাম। কিন্তু গ্রামে ঢুকেই জানতে পারলাম আমি যুদ্ধে যাওয়াই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাকে না পেয়ে আমার বাবাকে গুলি করে হত্যা করে ও আমার বোনকে ধর্ষণ করে। আমার বোন এই অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। পরে জানতে পারলাম এই কাজে সহযোগিতা করেছে আমাদের গ্রামের মসজিদের ইমাম মাওলানা আবদুল বাতেন। সে নাকি শান্তি বাহিনীর সদস্য ছিল। অবশ্য মুক্তিযোদ্ধারা তাকে গ্রামের সবার সামনে গুলি করে হত্যা করে। খালেক চাচার মা তখন কোনো উপায় না পেয়ে তার মামার বাড়িতে চলে যায়।

সবশেষে চাচাকে আমি বললাম যে, চাচা সরকার তো মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে তো আপনার এই অবস্থা কেন? চাচা বললেন,বাবা যখন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম তখন এত সুযোগ সুবিধা পাবো এই আশায় তো যুদ্ধে যায় নি।আর আমরা জানতামও না দেশ স্বাধীন হবে কিনা।

চাচাকে বললাম আপনি কোনো সুযোগ সুবিধা বা ভাতা পান না? চাচা বললেন, বাবা, আমার তো কোনো সনদই নাই,আমি কি করে ভাতা পাবো। চাচাকে বললাম আপনার সনদ নাই কেন? চাচা বললেন, অনেক চেষ্টা করছি কিন্তু হয় নাই। সনদ নিতে গেলে অনেক টাকা চাই।কিন্তু আমার কাছে অত টাকা নাই বাবা। আর দেশের জন্য যুদ্ধ করে যদি টাকা দিয়ে সনদ নিতে হয় তাহলে সেই সনদের আর দরকার নাই। তাই যতদিন বেঁচে আছি আমি চাই দেশের মানুষ,তরুন প্রজন্ম আমার কাছে, আমার মতো নাম না জানা হাজারও মুক্তিযোদ্ধার কাছে ঋনী থাক।

এভাবেই বেঁচে থাকুক এরকম হাজারও নাম না জানা সনদবিহীন মুক্তিযুদ্ধাদের গৌরবময় বীরত্বগাথা। বেঁচে থাকুক বাংলার মাটিতে, বাংলার মানুষের মাঝে।

৩। দেশের কল্যাণে আমি

মোঃ আহাদ বিন ইসমাইল

প্রতিটি দেশের নাগরিকের জন্য এটা খুবই সম্মানজনক যে সে তার নিজ দেশের জন্য, দেশের মানুষের কল্যানে কাজ করতে পারছে। মূলত এটা খুবই সাধারণ একটি বিষয় যে, নিজ দেশের জন্য সে দেশের মানুষেরাই কাজ করবে। আর দেশের উন্নয়নের গোপন রহস্য এটাই। সবাই যদি নিজ অবস্থান থেকে চিন্তা করে যে আমরা বাংলাদেশকে ভালোবাসি আর দেশের কল্যানে নিবেদিত তাহলে দেশের উন্নয়ন শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আমি মনে করি যে, “আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি” – এই কথাটার মধ্যে তুমুল শক্তি আছে, অনুপ্রেরণা আছে, সম্প্রীতি, ভালোবাসা আছে, স্নেহ, মায়া ও শ্রদ্ধার আধার এই ছোট একটি বাক্য। যে কেউ মন থেকে যদি বলতে পারে যে, “আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি” তাহলে বিপ্লব ঘটে যাবে, ইতিহাস সৃষ্টি হবে, পাহাড় নড়ে উঠবে, অসত্য অন্যায় আর অবিচার সেই শক্তির সামনে মুখ থুবড়ে পড়বে।

ছোটবেলায় স্কুল শিক্ষক পড়িয়ে ছিলেন নিজের দেশকে ভালোবাসবে আর নিজের দেশের জন্য কাজ করবে। তখন শিক্ষকের এই উপদেশটির মর্ম উপলব্ধি করতে পারি নি। পরে যখন বুঝতে পারলাম তখন থেকে আজ অবধি দেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছি। দেশের জন্য কাজের শুরুটা হয়েছিল ২০০২ সালে আজ থেকে প্রায় ১৭ বছর পূর্বে। তখন আমি বুঝতাম ও না যে স্বেচ্ছাসেবক কি জিনিস? ঠিক ঐ বয়সে যখন আমি ১০ম শ্রেণীতে পড়ি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তরুন বন্ধু (স্বেচ্ছাসেবক) হিসাবে নিবন্ধিত করি। সেই থেকে শুরু হয় দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য আমার পরিশ্রম, সাধনা ও পথচলা। আমি এখন পেশায় একজন সহকারী শিক্ষক।

আমি দৃঢ়ভাবে উপলব্ধি করেছি যে, শিক্ষকরা একটি সুন্দর সমাজের স্থপতি। সেই হিসাবে আমাদের দায়িত্ব সীমাহীন। কিন্তু একজন শিক্ষককে সর্বদা ব্যস্ত থাকতে হয় ছাত্রছাত্রীদের ভালো রেজাল্ট করানোর জন্য। এর মধ্যে আমি চিন্তা করেছি যে, তাদেরকে যদি দেশের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করা যায় ও হাতে কলমে কিভাবে করবে শেখানো যায় তাহলে ব্যাপারটা অসাধারণ হবে। সেই থেকে কাজ শুরু করি। ২০০৯ সালে দেশের ১ম হাসির ক্লাব যাত্রা শুরু করে আমাদের হাত ধরে। আমাদের কাজ ছিল রাস্তাঘাটের ময়লা পরিষ্কার করা, মানসিকভাবে একটি সুস্থ জাতি গঠনের জন্য নির্মল হাসির ব্যবস্থা করা। অন্যকে হাসানো এবং

নিজেও হাসা।

আমাদের স্লোগানগুলো নিম্নরূপ:

* ময়লায় ঢাকা ঢাকা,

আর যাবে না রাখা।

* হাসি হলো বড় চিকিৎসক।

* আমরা হাসি হুদাই,

একটা হাসি ১০টা রোগের বিদাই।

এই ক্লাবের মাধ্যমে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত রাস্তা ঝাড়ু– দিয়েছি ও শীতকালে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছি। এর মধ্যে আমার লেখাপড়ার কাজ ও চলতে থাকে। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমাদের কুড়িল বিশ্বরোডের জায়গাজমি সরকারী ভাবে একর হয়। আমরা বাড়ি ছাড়া হয়ে যাই। ঐ অবস্থায় প্রবল প্রতিক‚লতার মাঝে ও পড়ালেখা চালিয়ে যাই। অবশেষে আল্লাহর অশেষ রহমতে অনার্স ও মাষ্টার্সে প্রথম হয়ে ডাবল গোল্ড মেডালিস্ট হই।

এটা আমার জীবনের সেরা স্মরণীয় ঘটনা। তৎকালিন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আমাকে গোল্ড মেডেল পরিয়ে দিয়েছিলেন। আমি পারিবারিক ভাবে এতটা স্বচ্ছল না হলেও সব সময় ভাবতাম দেশের জন্য দেশের মানুষের কল্যানে কি করা যায়?

এরপর আমি লিবার্টি কলেজে যোগদান করি। সেখানে থাকা অবস্থায় ছাত্রছাত্রীদেরকে অনুপ্রাণিত করতাম। এমনকি ছাত্রছাত্রীদেরকে দিয়ে বনশ্রী এলাকায় ঘুরে ঘুরে শীতবস্ত্র সংগ্রহ করেছি। আমি নিজেও ভ্যান চালিয়ে বস্ত্র সংগ্রহ করেছি। পরে সেই বস্ত্রগুলো গরীব মানুষদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। যখন সিডর হয়েছিল, তখন এলাকা থেকে কাপড় সংগ্রহ করেছি, টাকা সংগ্রহ করেছি, স্যালাইন কিনেছি, বিস্কুট কিনেছি। পরে পিকআপ এ করে নিজ হাতে বরগুনা জেলার পাথর কাটায় গিয়ে দুর্দশা ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের হাতে ত্রান তুলে দিয়েছি।

ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্য প্রেরণ করেছি। নিজেরাও স্বশরীরে গিয়ে অবস্থা পর্যবেক্ষন করেছি। ইয়ুথ স্কুল অফ সোশ্যাল ইনট্রাপ্রেনারের সদস্য হয়ে কাজ করেছি। শিক্ষক হিসাবে আমি বিশ্বাস করি যে, বইপড়া ছাড়া একটি সুশিক্ষিত জাতি গঠন অসম্ভব। তাই আমি আমার নিজের বাসায় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেছি। সেই লাইব্রেরী থেকে ঢাকা শহরের মধ্যে মিরপুর, কুড়িল, উত্তরা ইত্যাদি এলাকায় আমি ছাত্রদেরকে বই দিয়ে আসি। তারা বই পড়ে ফেরত দেয়।

আসলে বই পড়ার অভ্যাসটা গড়ে তুলতে হয় ছোটবেলা থেকেই। তাই আমি টার্গেট করেছি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া ছাত্রছাত্রীদেরকে। এই সময় থেকেই ক্লাসের বই পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন আত্ম উন্নয়নমূলক বই, ছড়া, গল্প, কবিতা ও উপন্যাস ইত্যাদি বই পড়ার, জন্য ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকদেরকে অনুপ্রানিত করেছি। ফলে বেশ কিছু ছোট ছোট ছাত্র আমার কাছ থেকে বই নিয়ে ইতিমধ্যে পড়া শুরু দিয়েছে ও তারা বেশ আনন্দ পাচ্ছে। অন্যদিকে, আমি অত্যন্ত দু:খের সাথে পর্যবেক্ষণ করেছি যে এদেশে অনেক ছেলেমেয়ে টাকা পয়সার অভাবে লেখা পড়া করতে পারে না। তাদের বই ক্রয় করার সামর্থ্য নেই। তারা সারাজীবন নিরক্ষর থাকে। এই ক্ষেত্রে আমাদের পাশে দাড়িয়েছে মডার্ন হারবাল গ্রুপ | তারা এই বই ক্রয় করার খরচ বাঁচাতে গবেষনা করে এক পৃষ্ঠার বাংলা অক্ষর কার্ড তৈরী করেছে। এরকম হাজার হাজার কার্ড তারা ফ্রি দিচ্ছে। তাদের স্লোগান-

“একজন নিরক্ষর ব্যক্তিকে স্বাক্ষরতা কার্ড উপহার দিন ও শিখিয়ে দিন”

ফলে, আমি বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই স্বাক্ষরতা কার্ড নিরক্ষর ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছি। সামপ্রতিক সময়ে আমরা অনেক বড় একটা উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছি। আমরা লক্ষ্য করেছি, আমাদের সমাজে সবচেয়ে করুন অবস্থায় থাকে প্রতিবন্ধীরা। তারা নিজেরদের কষ্ট কারও কাছে প্রকাশ করতে পারে না। সমাজের মানুষগুলো তাদেরকে ঘৃনা করে ও তাদেরকে দেখে মজা করে। তাই আমি ও আমার বন্ধু উদ্যোগ নিয়েছি কিভাবে তাদেরকে সাহায্য করা যায়।

ইতিমধ্যে কয়েকজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রদের নিয়ে মাদ্রাসা হয়েছে। তারা সেখানে সম্পূর্ণ বিনাামূল্যে পড়ালেখা করছে। তাদের পড়ালেখার আগ্রহ দেখে আমরা হতবাক। তারা স্বাভাবিক বাচ্চাদের চেয়ে অনেক দ্রুত পড়া শিখে নিতে পারে। আমার বিশ্বাস তারা অনেক বড় হবে ও দেশের জন্য কাজ করবে। এছাড়াও প্রায় ১০০ জন প্রতিবন্ধীর লিস্ট আমরা করেছি। তাদেরকে কিভাবে দক্ষ, প্রশিক্ষিত করা যায় সেই বিষয়টা প্রক্রিয়াধীন। এখন আমি সক্রিয় সদস্য হিসাবে কাজ করছি ই-ক্লাবের সাথে। এছাড়া ও সক্রিয় সদস্য হিসাবে কাজ করছি ইয়ুথ ক্লাব অফ বাংলাদেশ এর সাথে। ইতিমধ্যে আমাদের ক্লাবের প্রেসিডেন্ট আরিফিন রাহমান হিমেল ভাই দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন।

কিন্তু একটা মজার বিষয় হলো প্রায়ই আমার ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে প্রশ্ন করে স্যার আপনি আপনার কাজের ভিডিও করেন না কেন? ফেইসবুকে সক্রিয় না কেন? আপনার কাজের রেকর্ড রাখেন না কেন? আমি তখন বলি শুন, আমি পুরস্কারের জন্য কাজ করি না, দেশের জন্য নিরবে কাজ করার মজাটাই আলাদা। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমি বিশ্বাস করি “বাংলাদেশ জিতলে, জিতব আমি”।

৪। ওডারল্যান্ড, বাংলাদেশের সত্যিকারের বন্ধু!

মুহাম্মাদ আলতামিশ নাবিল

ধরুন আপনি কোন এক দেশে একটি প্রতিষ্ঠানের বড়কর্তা হিসেবে কর্মপালনের উদ্দেশ্যে গেলেন। সবকিছু ভালোই চলছিলো, হঠাৎই সেদেশে শুরু হলো স্বাধীনতা কিংবা অধিকার আদায়ের জন্য যুদ্ধ। সে সময়টায় আপনি কি করতেন? গা বাঁচিয়ে নিজদেশে ফিরে আসতেন নাকি সেসব অধিকারের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতেন, তাদের পাশে থাকতেন!

ঘটনা ঘটনের সম্ভবনা প্রথমটাতেই প্রবল। তবে মানুষ মাত্রই ব্যতিক্রম, তেমনই এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তির নাম উইলিয়াম এ. এস ওডারল্যান্ড। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অবদানের জন্য একমাত্র বিদেশী হিসেবে ওডারল্যান্ড ভূষিত হন বাংলাদেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব “বীর প্রতীক”-এ।

একেবারে গোড়া থেকে শুরু করা যাক। ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডস এর আমস্টারডামে শহরে জন্মগ্রহণ করেন উইলিয়াম এ. এস ওডারল্যান্ড। হল্যান্ডে জন্ম নিলেও তার পিতৃভূমি ছিলো অস্ট্রেলিয়ায়। তার বয়স যখন মাত্র ১৭ বছর, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাকে লেখাপড়া ছেড়ে জীবিকার নিমিত্তে জুতা পালিশের কাজ নিতে হয়। পরে অবশ্য বহুজাতিক বাটা শু কোম্পানিতে জুতানির্মাতা হিসেবে চাকরী জুটে যায় তার। তবে সেখানে বেশীদিন মন টেকেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানিরা যখন নেদারল্যান্ডস দখল করছিলো, তার আগে ১৯৩৬ সালে ওডারল্যান্ড ওলন্দাজ জাতীয় সামরিক বাহিনী যোগদান করেন। সেখান থেকে তিনি রয়্যাল সিগনাল কোরে সার্জেন্ট পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৪৪ সাল তিনি পর্যন্ত উক্ত পদে বহাল ছিলেন ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজলে তিনি ওলন্দাজ বাহিনীর গেরিলা কমান্ডো হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জার্মানি যখন নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স ও বেলজিয়াম দখল করে সে সময়টায় বাকী সবার মত গ্রেফতার হন ওডারল্যান্ডও। তবে দুরন্ত কৌশলী ওডারল্যান্ড সেই যুদ্ধের বন্দীদশা থেকে পালিয়ে যান এবং এরপর জার্মানি ফেরত সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেবার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। একইসাথে জার্মান ও ওলন্দাজ ভাষায় পারদর্শীতার কারনে তাকে ওলন্দাজ গোপন প্রতিরোধ আন্দোলনের হয়ে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেন এবং সার্জেন্ট পদ পান।

তার বহুকাল পরে ১৯৭০ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান এর ঢাকায় আসেন উইলিয়াম এ.এস ওডারল্যান্ড। পদবী বাটা শু কোম্পানীর প্রডাকশন ম্যানেজার। তবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি নির্বাহী পরিচালক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এরমধ্যে ১৯৭১ এ দেশজুড়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। মার্চের গণ আন্দোলন, ২৫ মার্চ এর ভয়াবহ কালরাত্রিতে সংঘঠিত অপারেশন সার্চলাইট এবং পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর নির্বিচারে বাঙ্গালীকে হত্যাকান্ডের বর্বরতা দেখে বিষয়টি নাড়া দেয় ওডারল্যান্ডকে। জানা যায়, যুদ্ধ সালের ৫ মার্চ মেঘনা টেক্সটাইল মিলের সামনে তৎকালীন শ্রমিক-জনতার মিছিলে ইপিআর সদস্যদের গুলিবর্ষণের ঘটনা তিনি সামনে থেকে দেখেছিলেন এবং এটি তাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। অগত্যা সিদ্ধান্ত নেন তিনি যুদ্ধে বাংলাদেশের পাশেই থাকবেন।

বাটার মত এমন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বড়কর্তা হবার সুবাদে তার ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানে যাতায়তের অবাধ সুযোগ। এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তিনি পাক হানাদার বাহিনীর নীতিনির্ধারক মহলে অনুপ্রবেশ করে নতুন বাংলাদেশের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করতে শুরু করেন। প্রথমে তার সবচেয়ে সক্ষতা গড়ে ওঠে ঢাকা সেনানিবাসের ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্ণেল সুলতান নেওয়াজের সঙ্গে।

তার সঙ্গে সম্পর্ক তাকে ঢাকা সেনানিবাসে অবাধ যাতায়তের সুযোগ করে দেয়, চেনাজানা বাড়ে বড় বড় পাকিস্থানী সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে। সে সময়ের পশ্চিম পাকিস্তানের বাটার পার্সোনাল ম্যানেজার কর্নেল (অবঃ) নেওয়াজকে ওডারল্যান্ড কৌশলে ঢাকায় প্রতিষ্ঠানের কাজে ডেকে আনেন। এই অবসরপ্রাপ্ত কর্নেলকে কাজে লাগিয়ে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল টিক্কা খান, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফট্যানেন্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী, এডভাইজার সিভিল এফেয়ার্স মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি সহ সে সময়ের আরো অনেক সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন যারা মূলত পূর্ব পাকিস্তানে হামলার থিংক ট্যাংক বা প্রধান নির্দেশক হিসেবে ভূমিকা রাখতেন। নিয়াজীর ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টারতো তাকে একেবারে “সম্মানিত অতিথি” বানিয়ে নিলেন, আস্তে আস্তে তিনি জোগাড় করে ফেলেন সব ধরনের নিরাপত্তা ছাড়পত্র। ওদিকে যুদ্ধ সময়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানীর সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হতো। সে সময় গোপনে বাংলাদেশের পক্ষে নানা সহযোগিতা পেয়েছিলেন ঢাকাস্থ অস্ট্রেলিয়ান ডেপুটি হাইকমিশনের থেকে।

সেনানিবাসে সামরিক অফিসারদের অধিকাংশ গোপন আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করে তিনি এক পর্যায়ে পাকিস্তানীদের গোপন সংবাদ সংগ্রহ করে প্রেরণ করতেন মুক্তিযুদ্ধের ২নং সেক্টর এর ক্যাপ্টেন এ. টি. এম. হায়দার এবং জেড ফোর্সের কমান্ডার লেফট্যানেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান এর কাছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে মুক্তিবাহিনী পরিকল্পনা ও পরিচালনা করে সফল সব যুদ্ধাভিযানের। বর্হিবিশ্বে ভালো যোগাযোগ ছিলো বিধায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের গোড়ার দিকে এদেশে পাক বাহিনীর নৃশংসতা ও গণহত্যার আলোকচিত্র তুলে গোপনে বহিঃবিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন এবং উক্ত ছবিগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি বড় অবদান রেখেছিলো।

শুধু তথ্যই নয়, তিনি গোপনে নানা সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ ও আর্থিক সহায়তা করতেন। এখানেই শেষ নয়, যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত এত বড় যুদ্ধের আসরে গেরিলা কমান্ডোর অভিজ্ঞতা ছিলো তার, সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজে ২নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা শাখার সক্রিয় সদস্যরূপে বাটা কারখানাসহ টঙ্গীর বেশ কিছু গোপন ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত গেরিলা রণকৌশলের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। কমান্ডো হিসাবে তার ছিলো অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞতা। মুক্তিযুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি নিজেই নেমে পড়েন সম্মুখযুদ্ধে। বাংলাদেশী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে টঙ্গী-ভৈরবের রেললাইন ব্রিজ-কালভার্ট ধ্বংস করে পাকিস্থানী সেনাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলেন। তারই রণকৌশলে এবং পরিচালনায় সংঘটিত হয় ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় নানা অপারেশন। এ বিষয়ে গনমাধ্যমে ওডারল্যান্ড নিজেই জানিয়েছিলেন তিনি যেন এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইউরোপে তার যৌবনের অভিজ্ঞতাগুলো ফিরে পাচ্ছিলেন। 

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে যুদ্ধে বিজয় অর্জন করিয়ে ওডারল্যান্ড ঢাকায় নিজ কর্মস্থলে আবারো যোগদান করেন এবং ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এদেশে ছিলেন তিনি। এরপর অবসর নিয়ে পিতৃভূমি অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান। মৃত্যুর আগে ১৯৯৮ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদানের জন্য “বীরপ্রতীক” সন্মানে ভূষিত করেন। তবে অসুস্থ থাকায় বাংলাদেশে আসতে পারেননি ওডারল্যান্ড। তিনি কতটা বড় হৃদয়ের ছিলেন তার আবারো প্রমাণ মেলে যখন তিনি তার বীরপ্রতীক পদকের সম্মানীটি দান করে দেন মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে। তার স্মৃতিকে শ্রদ্ধাবশত রাজধানীর গুলশানের একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে তার নামে।

২০০১ সালের ১৮ মে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন মহান এ মানব। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গর্বভরে নিজ নামের সঙ্গে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবটি লিখতেন ওডারল্যান্ড। জীবনের শেষ প্রহরগুলোতে মাঝে মধ্যেই তিনি তার স্ত্রী ও কন্যাকে আনমনে বলতেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের ভালোবাসা; পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে আবেগের এ ধারা অব্যাহত রেখো!

৫। রক্ত যোদ্ধা

সুমাইয়া সুলতানা সিফা

আমি বলছি এক রক্ত যোদ্ধার কথা। নিয়মিত রক্তদাতা । রক্ত প্রয়োজন, এমন কথা শুনলে সে অস্থির হয়ে যায় রক্ত যোগাড় করে দিতে।

চার ভাই বোন এর মধ্যে ২য় আরিফ। ছোট বেলায় বন্ধু দের নিয়ে সাইকেল নিয়ে ঘুরতে ভালোবাসতেন। সে পরিবারের খুব পরিশ্রমী ছেলে। বিভিন্ন ভাবে দক্ষতা ও সফলতা দেখিয়েছেন। মিষ্টভাষী ও ভদ্র। নিজ এলাকায় তাকে সবাই খুব পছন্দ করে। অন্যকে সাহায্য করতে কখনো ভাবেনি।

যে ভাবে রক্ত যোদ্ধা হয়ে উঠলেন।

এক সময় তার বন্ধুর জাহিদ এর বড় ভাই এর জরুরি (AB+) রক্তের প্রয়োজন হল। জাহিদ ও তার পরিবার এর সবার রক্ত খুঁজে পাচ্ছিলনা। জাহিদ তার বন্ধু‌ আরিফ কে সব কিছু বললো, তারপর আরিফ তার কিছু বন্ধু কে বললো রক্ত খুঁজে দিতে। সবাই অনেক খুঁজে রক্ত পাওয়া গেল। তারপর আরিফ ভাবলো সে এমন কিছু করবে যেন কারো রক্ত প্রয়োজন হলে সাথে সাথে তখন ব্যবস্থা করা যায়।

প্রথমে, আরিফ তার ৫জন বন্ধু কে রক্ত এর বেপারে কথা বলে। সবাই আরিফ এর সাথে থাকবে বলে কথা দেয়। আরিফ আর অনুপ্রাণিত হয়। আরিফ প্রতিদিন ফেইসবুকে রক্ত দানে উৎসাহিত করার জন্য সুন্দর সুন্দর পোষ্ট করতেন ।

এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটেছিল, রাত ১টা কেউ একজন আরিফ কে কল দিল । আরিফ ঘুম থেকে উঠে কল রিসিভ করে সালাম দিল, ওপার থেকে একজন লোক বললো

কে আরিফ…?

জি বলুন

বাবা,তোমার রাসেল স্যার তোমার নাম্বার টা দিছে। বাবা আমার ছেলে তো এক্সিডেন্ট করছে সন্ধ্যায় এখন আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছি।বাবা জরুরি রক্ত লাগবে।বাবা আমার ছেলেটাকে বাঁচাও….(আমি শুনতে পেলাম লোক টা কান্না করছে)

আমি বললাম, আংকেল টেনশন করবেন না। আমি দেখতেছি। আংকেল রক্তের গ্রুপ কি….?

লোকটা বললো, বাবা (B+)

আমি বললাম আংকেল টেনশন করবেন না। আমি দেখতেছি, আপনিও দেখেন।

ফোন রাখার পর একটু ভাবলাম কি করা যায় রাত ১টার উপরে , কি করবো এহন। কিছুক্ষণ ভাবতেই মনে পড়লো আমার বন্ধু মৃদুল এর কথা। মৃদুল হাসপাতালে সাথেই থাকে। মৃদুল কে ৫টা কল দেয়ার পর কল রিসিভ করলে আমি তাকে খুব তাড়াতাড়ি সব বললাম।সে সব শুনে দিবে বললো । আমি আংকেল কে কল দিয়ে বললাম এবং মৃদুল এর নাম্বার দিলাম। মৃদুল রাত ২টায় রক্ত দিল। মৃদুল বাসায় গেল, আংকেল বললো রক্ত দেয়া শুরু করেছে, তা শুনে আমি ঘুমালাম।

রক্তস্বল্পতাঃ এক রোগী মা আরিফ কে ৩দিন‌ আগে বললো তার মেয়ের জন্য ১ ব্যাগ ( A+) রক্ত লাগবে। আরিফ ৩ দিন পর বললো রক্ত পাওয়া গেছে। সকাল ৯ টাই রক্ত দিবে। আরিফ আর রক্তদাতা সকল ৮:৫০ এ হাসপাতালে উপস্থিত হলো। রোগীর বাবা তাদের ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে বললেন,পরে আবার ৩০মিনিট অপেক্ষা করতে বললেন এভাবে থাকার পর ১২টা রোগী আসলেন এবং রক্ত নিলেন।

প্রায় সময় রক্তদাতার সকল খরচ নিজে বহন করেন।

আরিফ এ পর্যন্ত অনেক রোগী কে রক্ত ব্যবস্থা করে দেন। তাকে তার পরিবার, বন্ধুরা অনেক সাহায্য করে।

এ কাজের জন্য পেয়েছেন অনেক সংগঠন থেকে সম্মাননা। পেয়েছেন মানুষ এর ভালবাসা।

আরিফ বিভিন্ন ভাবে মানুষ কে রক্ত দানে উৎসাহিত করতে থাকলো। আরিফ শুধু তার এলাকায় না এই সেবা দিতে চেয়েছেন উপজেলা, জেলা না পুরো বাংলাদেশের মধ্যে।

আরিফ তার উপজেলার এবং জেলার কিছু রক্ত দান সংগঠন এর সাথে যুক্ত হয়। সংগঠনের সকল কর্মকান্ড অংশগ্রহণ করেন। আরিফ তার সংগঠন এর সাহায্যে অনেক মানুষ এর ফ্রি তে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে দিয়েছেন। প্রতি বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে আরিফ ও তার বন্ধুরা মিলে ফ্রি রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করান।

আরিফ একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। সব জাতীয় দিবস পালন করেন। সব স্বেচ্ছাসেবী কাজ করেন। বিভিন্ন ভাবে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত। আরিফ এর জন্য তার পরিবার এর সবাই কে মানুষ খুব ভালবাসে, সম্মান করে।

আরিফ নিয়মিত ৩মাস পর পর রক্ত দান করেন। স্বপ্ন দেখে সুন্দর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং রক্তের কোন‌ অভাব থাকবে না বাংলাদেশে। সবাই রক্ত দানে উৎসাহিত হবে।

এতক্ষন যে আরিফ এর কথা বললাম সে আমার বড় ভাই। আরিফ ভাইয়ার মতো ছেলে বাংলার ঘরে ঘরে দরকার।

সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

আরও দেখুন

অনুরূপ লেখা গুলো

Back to top button
Close
Close