ব্ল্যাকবেরি ফোনের ইতিহাস

Share

ব্ল্যাকবেরি ডিভাইস,যা মূলত ব্যবহার হতো টু-ওয়ে পেজার হিসেবে,পরবর্তীতে টেলিফোন,পেজার,পার্সোনাল অরগানাইজার,এবং আরো অনেক কিছু দিয়ে পৃথিবী তোলপাড় করে ফেলে। রিম (RIM) বা রিসার্চ ইন মোশন (Research in Motion) টেকনোলজি সম্বলিত প্রথম ডিভাইস বিক্রি শুরু করে। মূল ব্ল্যাকবেরি বিবর্তিত হয়ে আজকের আধুনিক ব্ল্যাকবেরিতে রুপান্তরিত হয়েছে যা মূল ব্ল্যাকবেরিকে করেছে বিলুপ্ত। তারপরও,অনেকেই আছেন যারা খাঁটি ব্ল্যাকবেরি ব্যবহারকারী এবং তাঁরা কখনই ব্র্যান্ড পরিবর্তন করবেন না – কেবল উন্নত নতুন ডিভাইস ব্যবহার করবেন,এবং এমনকি তাদের পুরোনো ফোনটি ব্যবহারযোগ্য না হলেও।

মূল ব্ল্যাকবেরির অধিকাংশই কালো রঙের ছিল। “ব্ল্যাকবেরি” নামটি পছন্দ করেছিল তাদের মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান, যা ডিভাইসটিকে সারা পৃথিবীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো। এর রঙের জন্য,“ব্ল্যাক” শব্দটি ছিল উপযুক্ত,কিন্তু ডিভাইসের একটি আকর্ষণীয় নামের প্রয়োজন ছিল। তাদের মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান,লেক্সিকন ব্র্যান্ডিং,ব্ল্যাকবেরি নামটি পছন্দ করে,কারণ এর ছোট কীবোর্ডের কীগুলো দেখতে ছোট ব্ল্যাকবেরি ফলের গায়ের খোসার মতো – আর এভাবেই জন্ম নিলো “ব্ল্যাকবেরি”।

মূল সিরিজের ব্ল্যাকবেরি ডিভাইস,যা সর্বপ্রথম বাজারে এসেছিল তা হল 850 ও 857 সিরিজ। সেগুলো ছিল শুধু পেজার ডিভাইস,যা DataTAC নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতো,এটি একটি অতি পুরনো নেটওয়ার্কিং সিস্টেম যেটি আজকাল ব্যবহার হয় না বললেই চলে। আজকাল উচ্চ ফ্রিকুয়েন্সির ডিভাইস,ওয়্যারলেস ব্যবহারকারী যারা অনেক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে থাকেন তাদের জন্য ব্ল্যাকবেরি DataTAC-এর বদলে আরো নির্ভরযোগ্য ও উচ্চ ফ্রিকুয়েন্সির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা শুরু করে।

ব্ল্যাকবেরি ফোন,আজকের আধুনিক ডিভাইসের পূর্বসূরি,নানা রকম পরিষেবা এবং নেটওয়ার্ক কম্প্যাটিবিলিটি নিয়ে প্রথম বাজারে আসে ২০০৩ সালে। এটি ওয়্যারলেস বাজারে ঝড় তোলে। ব্ল্যাকবেরি ফোনে,এর জনপ্রিয় ব্যবহারগুলোর মধ্যে রয়েছে,ই-মেইল চেক করা,ইন্টারনেট ব্রাউজ করা,ইন্সট্যান্ট ম্যাসেজ পাঠানো,ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফাক্স পাঠানো,পার্সোনাল প্ল্যানার,অ্যালার্ম ঘড়ি হিসেবে ব্যবহার এবং একটি টেলিফোন হিসেবে এর ব্যবহার। ব্ল্যাকবেরির অনেক অ্যাপ্লিকেশন রয়েছে যা এর ব্যবহারকে আরো ত্বরান্বিত করে। ব্ল্যাকবেরি অ্যাপ ওয়ার্ল্ড ডাউনলোড আপনার ডিভাইসের ফিচার আরো বাড়িয়ে দেবে।

ব্ল্যাকবেরির অনেক ধরণের মডেল রয়েছে,যা থেকে আপনি আপনারটি বেছে নিতে পারেন। তাদের আকার ও ফিচারে অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে,তাই আপনি কোন ব্ল্যাকবেরি কিনবেন সেটি আপনার নিজস্ব পছন্দের উপর নির্ভর করে। ব্ল্যাকবেরি পার্ল (Blackberry Pearl) সিরিজ বাজারে আসে ২০০৬ সালে। আমেরিকায় T-Mobile সর্বপ্রথম ক্যারিয়ার ফোন হিসেবে এটিকে বাজারে আনে। এই সিরিজের স্মার্টফোনের উন্নত সংস্করণের মধ্যে ভাল ক্যামেরা এবং মিডিয়া প্লেয়ার রয়েছে,কাজেই এটি তাঁর গ্রাহকদের শুধু টেলিফোনে কথা বলাই নয়,বরং ভাল মানের ছবি তোলা এবং কাজ বা হাটা বা অন্য যে কোনো সময় গান শোনার সুযোগ করে দেয়।

ব্ল্যাকবেরি কার্ভ (Blackberry Curve) ছিল জনপ্রিয় ব্ল্যাকবেরির একটি উন্নত মডেল। ২০০৬ সালে আসা পার্লের নানা ফিচার সহ বাজারে এসে, Curve 8300 সিরিজ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পায়। 8300 সিরিজে যা ছিল না,তা হল ওয়াই-ফাই এবং 3G প্রযুক্তি,যা অন্যান্য মোবাইলের ভিড়ে এটিকে প্রায় বিলুপ্ত করে দেয়। রিম (RIM),যারা টাচ স্ক্রিন ফিচার সাপোর্টের জন্য সর্বপ্রথম “রিসার্চ ইন মোশন” (“Research in Motion”) প্রযুক্তি আবিস্কার করে,বাজারে নিয়ে আসে ব্ল্যাকবেরি স্টোর্ম (Blackberry Storm) সিরিজ। কিছু কিছু ব্ল্যাকবেরি টাচস্ক্রিন সেটে কিবোর্ডও ছিল,কিন্তু 9500 সিরিজ পুরোপুরি টাচ স্ক্রিন।

এটি বাজারে আসার পর,ব্ল্যাকবেরি বাজারে আবার শীর্ষস্থান ফিরে পায় কেবল তার সহজ প্ল্যাটফর্ম,কম দাম,এবং সাধারণ মানুষের কাছে এর সহজ লভ্যতার জন্য,অর্থাৎ যে কেউ সহজেই এটি কিনতে পারতো এবং সহজেই এর প্রেমে পড়ে যেতো। বিশেষ করে যারা ব্যাবসা করত,তারা ব্ল্যাকবেরির অনেক ফিচারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে,যেমন- সংগঠিত থাকা,নিউইয়র্কের পথে প্লেনে বসে টোকিওতে থাকা কোনো বন্ধুকে ফ্যাক্স করার সুযোগ;এবং কোনো কম্পিউটার ব্যবহার না করেই। সবকিছুই সম্ভব হয় তাদের হাতের সমান ছোট এই ডিভাইসটি দিয়ে।

খুব দ্রুতই অন্যান্য প্রতিষ্ঠান মূল ব্ল্যাকবেরির ফিচারগুলোর বিভিন্ন বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে শুরু করে। নান্দনিক সৌন্দর্য একটি মুখ্য বিষয় হয়ে দাড়ায় যখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নানা রঙ এবং ডিজাইনের ফোন বাজারে আনতে শুরু করে। ব্ল্যাকবেরির নতুন ডিভাইসগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি,কিবোর্ড এবং ডিজাইন নিয়ে আসা হয়, যা দেখতে বেশ আকর্ষণীয় ছিল,এবং পাশাপাশি এমন সব ফিচার নিয়ে আসে যা তার কার্যকারিতার চাইতে দেখতে বেশ আকর্ষণীয় ছিল। যেমন,নতুন মডেলগুলোতে এমন কিবোর্ড নিয়ে আসা হয় যা “থাম্বিং” (“thumbing”) সাপোর্ট করে- অর্থাৎ দশটি আঙুল ব্যবহার না করে শুধু বুড়ো আঙুল ব্যবহার করলেই চলে,যেটি বেশ সুবিধাজনক। অন্যান্য মডেলে পুশ-টু-টক (push-to-talk),স্ক্রলিং (scrolling) এবং এরকম আরও অনেক ফিচার সম্বলিত মোবাইল ডিভাইস বাজারে আনে।

ব্ল্যাকবেরির এতসব বিবর্তন এবং উন্নয়নের পরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ অর্থনৈতিক বাজারে তার অবস্থান হারাতে থাকে এবং তাদের টপ ব্যবস্থাপনাকে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ২০১৩ সালের আগস্টে ব্ল্যাকবেরি ঘোষণা দেয় যে তারা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দেবে। ব্যাপক চেষ্টা ও মার্কেটিং কৌশল অবলম্বন সত্ত্বেও ব্ল্যাকবেরি,অ্যাপেল ও নোকিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতা টিকে থাকতে পারেনি।

সেপ্টেম্বর ২০১৩ তে,১০% মালিকানার অংশীদার একটি প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকবেরি কেনার প্রস্তাব দেয়। ব্ল্যাকবেরি সাময়িকভাবে প্রস্তাব গ্রহণ করে,এবং অন্য উপায় খোঁজার জন্য নভেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত সময় নেয়। নভেম্বরে,ব্ল্যাকবেরি নতুন সি ই ও,জন এস.চেন (John S. Chen) কে নিয়োগ দেয়। নতুন ব্যবস্থাপনা সিদ্ধান্ত নেয় তারা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করবে না, এবং তারা তাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।

জুলাই ২০১৪ তে,ব্ল্যাকবেরির অবস্থা ভাল হতে শুরু করে। তারা তাদের হারানো গৌরব ফিরে পায় কেবল তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল হওয়ার কারণে নয় বরং তাদের হ্রাসকৃত মূল্যের কারণে। এরপর,ব্ল্যাকবেরি বাজারে নিয়ে আসে “পাসপোর্ট” (“Passport”)। এইহ্যান্ডসেটটি,৪.৫ ইঞ্চি বর্গাকার,সম্পূর্ণ এইচ ডি রেজ্যুলেশন স্ক্রিন সম্বলিত,স্বাস্থ্য,স্থাপত্য,শিল্প ব্যবস্থাপনা,এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে তার নিজস্ব জায়গা করে নেয়। এর আকার শুধুমাত্র সেই গুণগতমান ও প্রযুক্তিই ধারণ করে না বরং এটি আপনার মানিব্যাগেও জায়গা করে নেবে।

প্রাপ্তবয়স্কদের ৯১% মানুষই সেলফোন ব্যবহার করেন। এছাড়াও রয়েছে লক্ষ লক্ষ কিশোর-কিশোরী। সহজ ও নিয়মিত ব্যবহারের জন্য অনেক মানুষের বাড়িতেই এখন আর ল্যান্ডফোন নেই। ত্রিশ বছর আগে মানুষ সেলফোন টেলিভিশনে দেখতো এবং সেটিকে অনেক দূর ভবিষ্যতের বিষয় মনে করত। আর আজকাল,এটা না থাকাটাই বরং অস্বাভাবিক। ব্ল্যাকবেরির কল্যাণে,যারা রিম (RIM) টেকনোলজির মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিল এবং সেটিকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে গিয়েছিল,আমরা আজ মোবাইল ডিভাইসের বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করছি। সবকিছু কেবল দুটি জিনিস নিয়ে শুরু হয়েছিল,ওয়ে বিপারস এবং ভিশন, এবং মনে হয় না এখানেই ব্ল্যাকবেরির শেষ।

সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

Comments

comments