Bikroy আপডেট

‘50 Years of Bangladesh’ গল্প প্রতিযোগিতার ৩টি বিজয়ী গল্প

দেশপ্রেম ও বীরত্বের অজানা উপাখ্যান

৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মার্কেটপ্লেস Bikroy.com আয়োজিত ‘50 Years of Bangladesh’ গল্প প্রতিযোগিতায় ১০০ এরও বেশি সংগৃহীত গল্পগুলো থেকে সেরা তিনটি গল্প বাছাই করে লেখদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছেন মোঃ ফাহাদ হোসেন ফাহিম, দ্বিতীয় হয়েছেন দৃপ্ত সরদার সুজন এবং তৃতীয় হয়েছেন মোঃ ময়নুল ইসলাম। গত ১১ এপ্রিল, ২০২১ একটি ওয়েবিনার সেশনের মাধ্যমে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং তাঁদেরকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হয়। বিজয়ীদের এসব গল্পে উঠে এসেছে সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশপ্রেমিকদের দেশের প্রতি ভালোবাসা, আত্মত্যাগ আর বীরত্বের উপাখ্যান। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে এবার তুলে ধরা হলো বিজয়ীদের সেসকল গল্পঃ

১. একটি নেউলের গল্প

মোঃ ফাহাদ হোসেন ফাহিম

পঙ্কিল প্রান্তর ওকে ডাকে। ও চলে যায় সন্তর্পণে। ধানখেতের থ্যাবড়া আল থেকে দেখে পাঁচটি জিপ গাড়ি ও তিনটি ট্রাক প্রবেশ করেছে গ্রামে। ট্রাক ভর্তি মিলিটারির বহর। জিপ গাড়ি দেখে নিজেকে খুব সৌভাগ্যশালী মনে করে ও। দেশে যুদ্ধ লাগাতে ওর মনে একধরনের আনন্দের লহরি বইছে। কারণ যুদ্ধ না লাগলে এতগুলো গাড়ি দেখার সৌভাগ্য ওর হত না। আঁটে ঘাটে ঝড়ো কাকের আশঙ্কা থাকলেও, ওর মনে খুব আনন্দ। খুশি হয়ে আইল দিয়ে হাটঁতে হাটঁতে বলতে থাকে – ‘বড় বড় টেসকি, আমি জিপ গাড়ি দেসকি।’ এর আগেও একবার আল্লাদে আটখান হয়েছিল ও। এরকম জিপ গাড়ি দেখেই। সেদিন জিপ গাড়ি দেখতে গিয়ে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়েছিল ওকে। সমরকেন্দ্র এখান থেকে অনেক দূর। কিন্তু আজকে যে জিপ গাড়ি নিজে থেকেই চলে এসেছে ওর গায়ে। তাই জিপ গাড়ির আগমনকে ওর কাছে মনে হয় শাপে বর। গান গাইতে গাইতে বিজন পথ ধরে হাঁটতে লাগে। যতদূর দৃষ্টি যায় সবকিছুই ওর। সবুজ মাঠ, শান্ত নদী, নীলচে আকাশ, দূরের পাহাড়, সারি সারি কড়ই গাছ, ধবল বকের আস্তানা, মরণসাগর দিঘি; হাড়হদ্দ সবকিছুই ওর। কিন্তু একি! আকাশের বুকে ধোঁয়ার শামিয়ানা! আগুন লাগলো কোথায়? এগুতেই দেখে বাজারে আগুন জ্বলছে মাছের আড়তে। কিন্তু আগুন কোথা থেকে এলো! ও বুঝে না। মরণসাগর দিঘি থেকে জল এনে ও একাই আগুন নেবানোর চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু পারে না। গ্রামের আর সব মানুষ কোথায় গেলো! নিভৃতে ভাবতে লাগে ও। সরগরম মাছের আড়ত নিমিষেই যেন নির্জীব হয়ে পড়েছে। আশেপাশে কেউই নেই। এদিকে মাছের আড়তের আগুনের তেজ ভীষণ, মরণসাগরের জল এ আগুনের কাছে বড়োই তুচ্ছ; যেমনটা পাকিস্তানি মিলিটারিদের কাছে গ্রামবাসী। কিন্তু হার মানে না ও। দিনকে রাত করে বস্তা বস্তা বালি আর মরণসাগরের জলে ঠিকই আগুন নিভিয়ে ফেলে ও। তবে আকাশের নীল হাসি দেখার সুযোগ ওর হলো না। আগুন নেভাতে নেভাতে সন্ধ্যার ধূসর শামিয়ানায় আবৃত হয়ে গেছে ওর আকাশ।

অনেকটা ক্লান্তি এসে ভর করলেও জিপ দেখার আনন্দের কাছে মার খেয়ে যায় ওর শ্ৰান্তি ও অবসাদ। কিছুক্ষণ পর হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে গুরমি কাকির কাছে। এসেই ডাকাবুকো ভাব নিয়ে জোর গলায় বলতে লাগে, ‘ও কাকি, আছো নাকি? পান্তা দেও, পান্তা খামু।’ গুরমি কাকির উদবিগ্ন চাইনি দেখে ও জিজ্ঞেস করে, ‘কি অইছে কাকি? পান্তা নাই।’ কাকি ওর হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গিয়ে বলে, ‘শুন মানিক। মিলিটারি আইছে গ্রামে। বাজারে আগুন দিছে। যারে পাইসে তারেই ধরে নিছে। বড় গলায় কতা কইছ না আর।’ কাকির চোখে চেয়ে ও বলে, ‘কথা কইতাম না কেন। এইডা তো আমাগো গেরাম।’ উচ্চরবে ও বলতে থাকে- ‘বড় বড় টেসকি, আমাগো গেরামে দেসকি।’ গুরমি কাকি টেসকির কথা জিজ্ঞেস করতেই ও বলে, ‘মুদিবাড়ির রাস্তা দিয়া যাইতে দেকসি। তারপর আমি খেতের মধ্য দিয়ে ঘুরে এসে দেখি বাজারে আগুন। আমিই আগুন নিভাইছি কাকি।’ বর্ষীয়সী গুরমি কাকি ও জড়িয়ে ধরে বলে,’ তুই নিভাইসত। সত্যি কইতাছোস মানিক।’ ‘হো কাকি। আমিই নিভাইছি।’ ‘আয় তোরে পান্তা দেই।’ ও প্রাণ ভরে পান্তা খায়। আর বলতে থাকে একাই দক্ষিণ হস্ত হয়ে কিভাবে মরণসাগর দিঘি থেকে জল এনে নিভিয়েছে বাজারের আগুন। গুরমি কাকিকে আগুনের কথা জিজ্ঞেস করতেই বলে, ‘ঐযে জিপ ট্রাকের মিলিটারিরাই দিছে। হেরা নাকি ভিনদেশের লোক, পাকিস্তানি বাহিনী। এরা চায় এ দেশও পাকিস্তান অউক। চেয়ারম্যান সহ মিলিটারিরা আক্রমণ করছে গ্রামে।’ একথা শুনতেই ওর ছোট্ট মনে জিপ দেখার আনন্দটা মাটি হয়ে যায়। হিয়ার কোয়াড্রেটে শুরু হয় দেশপ্রেমের ডামাডোল। কারণ জিপ দেখার আনন্দের চেয়ে ওর কাছে গ্রামের শান্তি বড়। ও বুঝে গেছে জিপে করে যারা এসেছে তারা ভালো মানুষ না। শত্রু, তারা, এ গায়ের শত্রু। শত্রু, তারা, এ দেশের শত্রু।

ও খেয়াল করে গ্রামে জিপ গাড়ি আসার পর থেকেই গ্রামটা কেমন যেন নিবৃত্ত স্তব্ধ হয়ে গেছে। মানুষের আনাগোনা কমে গেছে। দুই একটা দোকান ছাড়া বাজারে আর দোকানগুলো বন্ধই থাকে। তা-ও দোকানে লাগানো থাকে জবরজং সাইনবোর্ড। কি যেন লিখে রাখা আছে তাতে। ও ঠিক পড়তে পারে না। তবে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগানের মতোই কিছু একটা লেখা রয়েছে তাতে। অনেক দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অনেক বাড়িঘরও। এর আগেও একবার আগুন দেখেছে ও। তখন খুব ছোট ছিল। গায়ে বল ছিল না। তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করবার শক্তি ওর ছিল না সেদিন। বাবা মা ভাইবোন সবাইকে একরাতে হারিয়ে সেদিন থেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়ে ও। তখন ওর বয়স মাত্র ছয় বছর। শোনা যায় স্টেশনের ট্রেন থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল ওদের বস্তিতে। বেঁচে গিয়েছিল ও। সেদিন যদি ও আজকের মতো বড় হতো, তাহলে হয়তো মরতে হতো না ওর বাবা মা ভাইবোনকে। সেদিন কাউকেই ও বাঁচাতে পারেনি। কিন্তু গ্রামে আবার মৃত্যু নামুক, কেউ মারা যাক, এরকম কিছু আর চায় না ও।

কয়েকমাস আগে গ্রামের চেয়ারম্যান মান্নান মোল্লার ছেলেকে সাপের হাত থেকে রক্ষা করেছিল ও। ঠিক নেউল যেভাবে সাপের দেহকে ক্ষত বিক্ষত করে দেয়, তেমনি। পাঁচটা সাপকে সেদিন একাই প্রাণে মেরেছিল ও। মা বাবা মারা যাবার পর ভয় কি জিনিস তা ও জানে না। আর সেদিনের ঘটনার পর থেকে গ্রামের মানুষ ওকে নেউল হিসেবেই চিনে। নেউলের মতো বিষের সন্ধানে নবিউল ও সিদ্ধ হস্ত। তাই মায়ের দেওয়া নবিউল নামের জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে নেউল নামটি। গুরমি কাকি ছাড়া সবাই ওকে নেউলই ডাকে। গুরমি কাকিও ওর মতো। স্বামী সন্তান মারা গেছে বস্তির আগুনে জ্বলসে। ট্রেনের পাশের বস্তিতেই ওরা থাকতো। সেদিনই মরে সাবাড় হয়ে গেছে গায়ের অর্ধেক লোক।

খিদে পেলে কাকির পান্তা দিয়ে ওর দিব্যি চলে। গাছের বরই, নারকেল, কামরাঙ্গা, বনের মিষ্টি কলা, স্কুলের টিউবয়েলের জল, মানিক চাচার চা বিস্কুট দিয়েই কেটে যায় ওর বেলা। আড়তদার শিবু ভাই খুব পছন্দ করে ওকে। প্রায়ই শিবু ভাই ওকে চিংড়ি পোড়া খেতে দেয়। চাঁদনি রাতে ও বলে, ‘চাঁদের আলো না খেলে আমার পেট ভরে না।’ চাঁদের আলো’ও কি খাওয়া যায়? ও নাকি প্রতি চাঁদনি রাতেই চাঁদের আলো খায়। শুধু চাঁদের আলোই না। সূর্যের আলোও পান করে ও। কিন্তু কিভাবে? মৌকে ও শিখিয়েছে কিভাবে আলো পান করতে হয়। কিন্তু মৌ নাকি এখনো রপ্ত করতে পারেনি সেই কৌশল। মৌকে ও বলেছিল, দেশ স্বাধীন হলে ওকে নিয়ে চাঁদের আলো পান করবে।

মান্নান চেয়ারম্যানের ছোট ছেলে মাহিন। ওর সমবয়সী। গ্রামের অদূরে সমরকেন্দ্রে বলী খেলা দেখার সময় মাহিনকে সাপের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল ও। সেদিনই পায়ে হেঁটে নবিউল গিয়েছিল জিপ গাড়ি দেখতে। ঐতিহ্যবাহী এই খেলা দেখতে খোদ মিলিটারির দলপতি আশরাফ সাহেবও এসেছিলেন সেদিন। করাচির মানুষ। খুব লম্বা, চওড়া, শক্তিশালী। ও শুনেছে সেই মিলিটারিরাই নাকি দখল করেছে ওদের গ্রাম।

বিকেল বেলা ও হাঁটতে থাকে বনের পথ ধরে। এর আগে কয়েকবার স্কুলের মিলিটারি ক্যাম্পে গিয়েছিল ও। ওর কলা খেয়ে পাকিস্তানি এক সৈনিক বলেছিল – ‘বহুত আচ্ছা। বহুত মিঠা হে।’ ও মানে বোঝে না। রাজাকার বাহিনীর একজন ওকে বলে প্রতিদিন এসে কলা খাওয়াতে। বয়সে ছোট মানুষ। তেরোতে পা দিয়েছে এবার। তাই মিলিটারি ও রাজাকার বাহিনী ওর উপর সন্দেহ করে না। ও নেহাতই চুনোপুঁটি ওদের কাছে। তাছাড়া সবাই জানে ও পাগল ছেলে। তাই ওকে নিয়ে কারোরই মাথা ব্যাথা নেই। বনের পথ বন্ধুর, দুর্গম রাস্তা। আলের পর আল পাড় হয়ে নদী। তারপর বন। তাই ঐ পথে কেউ যায় না। কিন্তু ও যায়। কলা খেতে। মিলিটারিদের জন কলা আনতে। বন্য কলা। সময় অসময়ে পেকে ঝুলে পড়ে গাছের শরীরে। মিষ্টি কলা, সাগরকলা। বনের ভেতর বাঁশ ঝাড়ের নিচে চোখ পড়তেই ও খেয়াল করে বন্দুক হাতে গোল করে বসে আছে দশ বারোজন। ও চুপিচুপি এগুতেই দেখতে পায় শিবু ভাই, সাথে আরও অনেকে। শিবু ভাই, শিবু ভাই বলে চিৎকার করে ওঠে ও। এতোদিনে ও বুঝে গিয়েছে গ্রামের মানুষ দুই দলে বিভক্ত। এক দল ভালো, যারা যুদ্ধ করে লুকিয়ে লুকিয়ে। এরা মুক্তিযোদ্ধা। আরেকদল পাকিস্তানি বাহিনী। এ দলে আছে মিলিটারি, রাজাকার আর রাজাকার প্রধান চেয়ারম্যান মান্নান মোল্লা। শিবু ভাইকে দেখেই ও জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিসো ভাই?’ শিবু ভাই কিছু না বলে ওকে চলে যেতে বলে। ও চলে যায়। এদিকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা অপেক্ষা করছে ওর জন্য, কখন কলা নিয়ে আসবে। কিন্তু ওকে খালি হাতে ফিরতে দেখে এক মিলিটারি বলে উঠে – ‘কেলে কাহা হ্যায়? তুম খালি হাত কিও?’ ও বুঝে না কিছুই। তবুও বলতে থাকে, ‘কলা নেই। শেষ হয়ে গেছে।’ রাজাকার শাফি ওর ঘাড়ে জোরে চেপে ধরে বলে, ‘শুয়োরের বাচ্চা একটা গুলি করে খুলি উড়ায় দিমু। কলা আনোস নাই কেন।’ ও কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, ‘কলা এখনো পাকে নাই। তাই ফিরা আইসি।’ ছাড়া পেয়ে এক দৌড়ে ও ফিরে আসে বনের মধ্যে। লুকিয়ে লুকিয়ে শুনতে থাকে শিবু ভাইয়ের কথা। কথা শুনে ও বুঝতে পারে, গ্রামে চারটা মিলিটারি ক্যাম্প ছিল। এখান একটা। এ গ্রামে মুক্তি বাহিনীর কমান্ডার শিবু ভাই। তিনটা ক্যাম্পে ইতোমধ্যে তারা আক্রমণ করে সবকিছু শেষ করে ফেলেছে। তাই সেদিন বাজারের সবকিছু পুড়িয়ে ফেলেছিল মিলিটারিরা। ধরেও নিয়ে গেছে যাকে পেয়েছে সামনে। মেরেও ফেলেছে অনেককেই।

ও সামনে গিয়ে শিবু ভাইকে বলে, ‘এই দেহো হেরা কত মারছে আমারে। আমিও তুমাগো লগে যুদ্ধ করমু ভাই। আমারে তুমাগো দলে নাও।’ শিবু ভাই প্রথমে ওকে নিতে মানা করলেও অলি ভাইয়ের অনুরোধে ওকে দলে নিয়ে নেয়। অলি ভাই বলে, ‘সেদিন যখন মিলিটারিরা বাজারে আগুন দিয়ে চলে যায়, আমি পুকুরে কচুরিপানায় লুকিয়ে ছিলাম। আমি দেখেছি কিভাবে ও আগুন নিভানোর কাজ করছিল। ও পারবে। ওকে দলে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।’ অবশেষে শিবু ভাই বলে, ‘ঠিক আছে। তুই আমাগো লগেই থাকবি। আর এর বাইরে কেউ যেন এ ব্যাপারে কিছু জানতে না পারে। তুই যুদ্ধ করবি না। তুই আমাদের জন্য পানি আনবি, ফল নিয়ে আসবি… ‘ ও খুশি হয়, জিপ গাড়ি দেখার চেয়েও বেশি খুশি আর সৌভাগ্যবান মনে করে নিজেকে।

সন্ধ্যায় মুক্তিবাহিনী প্ল্যান করে আগামীকাল আক্রমণ করবে মিলিটারি ক্যাম্পে। কিন্তু কিভাবে? ওদের সব রাস্তাই এখন বন্ধ। আগের তিনটা ক্যাম্পের সব মিলিটারি মারা যাওয়াতে এবার বেশ শক্ত হয়ে গেছে এরা৷ নতুন সৈন্য, অস্ত্র, বোমা, গাড়ি নিয়ে এসেছে শহর থেকে। এ পর্যন্ত দু’শ জন মুক্তিযোদ্ধাও মারা গেছে। গুম হয়েছে অনেকেই। বেঁচে আছে ওরা কয়েকজন। একদিকে মিলিটারি অন্যদিকে রাজাকার বাহিনী। ওরা কি পারবে? চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়ে শিবু ভাই। পেছন থেকে নবিউল বলে উঠে, ‘একটা কাম করোন যায়। হেরা কলা খাইতে পছন্দ করে। কলার মধ্যে বন্য গাছের বিশ মিশায় দিলে…..’ শিবু ভাই চমকে উঠে বলে,’ তুই পারবি?’ ও বলে, ‘পারবো বৈকি।’

শুরু হয় ওদের অপারেশন ‘জয়বাংলা’।

হাসতে হাসতে এক গাউর কলা নিয়ে ক্যাম্পে গিয়ে মিলিটারিদেরকে বলে, ‘এই নাও, তুমাগো লইগ্যা নিয়া আইছি। অনেক মিষ্টি।’ কলা রেখে ও চলে যায়। যেমন প্ল্যান তেমন কাজ। কলা খেয়ে পাঁচজন মিলিটারি বিষক্রিয়ায় মারা পড়ে রাতের মধ্যেই। এমন কায়দায় কলার মধ্যে বিষ মিশিয়েছে বাইরে থেকে বুঝার কোনো উপায় নেই। মিলিটারিরাও বুঝে গেছে সবই ওর কাজ। তাই হন্যে হয়ে ওরা খুঁজতে থাকে ওকে। কিন্তু ওকে আর কে পায়! ওর মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা, যেদিন ও পাঁচটা সাপকে মেরেছিল। সেদিনের মতো আজকেও নিজেকে নেউল ভাবতে লাগে। ও নেউল হলে পাকিস্তানিরা সাপ, বিষাক্ত সাপ। ও পাকিস্তানি মিলিটারিদের সাপই ভাবতে লাগে। আর মনেমনে প্রতিজ্ঞা করে নেউল হয়ে পাকিস্তানি সাপের বাহিনীকে চিরতরে শেষ করে দেবে। কিন্তু বুঝে উঠতে পারে না, চেয়ারম্যান সহ গায়ের অনেক লোক কেন পাকিস্তানের দলে। এরা কি চায়! এরা কি দেশকে ভালোবাসে না?

দশ দিন পর মৌয়ের সাথে ওর দেখা হয় বনের রাস্তায়। এতোদিন শিবু ভাইয়ের সাথে ট্রেনিং এ ছিল ও। পাশের গ্রামে দেখা গণকবরের কথা ও মৌকে বলে। মৌ ওকে বলে- ‘নেউলরে আমি মায়ের সাথে চলে যাচ্ছি মামার বাইত। তুই সাবধানে থাকিস৷ দেশ স্বাধীন হলে তোরে নিয়া চান্দের আলো পান করমু।’ মৌ ওকে এও জানায়ঃ ‘আমি আর চেয়ারম্যান কাকার মেয়ে মিলি রাতে ঘুমাইতেছিলাম। মিলিটারির সেনাপ্রধান হঠাৎ দরজার কড়া নাড়তেই, আমরা ভয় পেয়ে যাই। দরজা খুলতেই মাতাল মিলিটারি আমাদের কাছে আসতে লাগে। আমি কোন রকমে বাইরে বের হয়ে পড়ি। মিলিকে বাঁচাতে চেয়ারম্যান কাকা গেলে তাকেও মেরে ফেলা হয়। মিলির জীবন নষ্ট করে মিলি মাহিনকেও মেরে ফেলে ওরা।’

চেয়ারম্যানের কথা ভাবতেই ও বলে উঠে, ‘দেশের শত্রু যারা অয়, হেগর পরিণতি বোধহয় এইরহমই।’ কিন্তু ওর কষ্ট হয় মাহিনের জন্য, মিলির জন্য। মিলির মতো কত মেয়ে এভাবে সর্বস্ব হারিয়েছে! কষ্ট ফেটে যায় ওর বুকটা। মৌকে এগিয়ে দিয়ে ও একাই হাঁটতে থাকে আল ধরে।স্বপ্ন দেখে স্বাধীন দেশে মৌকে নিয়ে চাঁদের আলো পান করছে। কেউ থাকবে না ওদেরকে বাঁধা দেওয়ার। ফিরে পাবে ও স্বাধীনতা।

হঠাৎই পেছন থেকে রাজাকার শফি ওকে ধরে ফেলে। নিয়ে যায় মিলিটারি ক্যাম্পে। নিয়ে যাবার সময় ওর পায়ে কাচ বিঁধে যায়। হাত পা বেঁধে ওকে রাখা হয় ক্যাম্পের এক কোণায়। সবাই মিলে ঠিক করে, সকালেই মেরে ফেলবে ওকে। মিলিটারিরা বলতে থাকে – ‘একদিন সাব লোক মারেগা। সাবকো, সাব লোক।’ ও কিছুই বুঝে না। গভীর রাত। ছটফট করতে লাগে। পা থেকে অঝোরে বের হচ্ছে রক্ত। ওর মনে পড়ে মায়ের কথা, বাবার কথা, শিবু ভাইয়ের কথা, মৌয়ের কথা, গুরমি কাকির কথা। ও দেখে পাশেই একটা নেউল যুদ্ধ করছে সাপের সাথে। তিনটি সাপকে মেরে বনের দিকে রওনা করছে নেউলটা। চাঁদের আলোতে সবকিছু খুব স্পষ্ট দেখেছে ও। কোনরকমে দড়ি কামড়ে হাতটা ছাড়িয়ে পা থেকে কাচ বের করে সেই কাচ দিয়ে পায়ের বাঁধন খুলে ফেলে ও। শিবু ভাই ওকে শিখিয়েছে কিভাবে পিস্তল চালাতে হয়। ঘুমিয়ে থাকা এক মিলিটারির পিস্তল নিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে দেয়।

এদিকে গভীর রাতে ওকে বাঁচাতে শুরু হয় মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ। ও একাই পাঁচটা পাকিস্তানি সাপকে মেরে ফেলে। শুরু হয় তুমুল লড়াই। এক পর্যায়ে রাজাকার বাহিনী ওকে আক্রমণ করলে ও ঝাপ দেয় মরণসাগর দিঘিতে। দীর্ঘ লড়াই শেষে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনে মুক্তিবাহিনীর দল। রাজাকার বাহিনী, মিলিটারি বাহিনী সব খতম। পড়ে আছে পাকিস্তানি সাপেদের নিস্পন্দ দেহ। জয় বাংলা ধ্বনির সাথে সাথে সবার মুখে একটাই প্রশ্ন- ‘নেউল কোথায়?’ ফজরের আজানের সাথে সাথে ওরা শুনতে পায় নেউলের শেষ শব্দটুকু- ‘যুদ্ধ আমি করসি, স্বাধীন দেশ দেকসি; যুদ্ধ আমি করসি, স্বাধীন দেশ দেকসি।’ মরণসাগরের জল লাল হয়ে গেছে ওর রক্তে। দিঘির কচুরিপানার ওপর মুমূর্ষ হয়ে পড়ে আছে ও৷ ভোরের আলো পৃথিবীকে যতই আছন্ন করতে থাকে, ততই নিঃশেষ হতে থাকে ওর প্রাণ বায়ু। নিভু নিভু চাঁদ ওকে দেখে বলে উঠে, ‘দেখেছি আমি শহিদ নেউলের হাসি, স্বাধীন বাংলাকে বড়োই ভালোবাসি।’

২. মাটির টান

দৃপ্ত সরদার সুজন

বাগেরহাট মহকুমার মোড়েলগঞ্জের কাছাকাছি জায়গাগুলোর সম্পর্কে নানা জনশ্রুতি প্রচলিত। কেউবা বলে এই জায়গা নাকি পুরোই সুন্দরবন ছিল কালক্রমে এগুলো নাকি পশুদের বিলুপ্তিতে মনুষ্য বসতিতে পরিণত হয়েছে। সে যা হোক, এ অঞ্চলে কখন কিভাবে বসতি শুরু হয়েছে সে ধারণা অস্পষ্ট। কোথাও লিখিত কোন প্রমাণ মেলে না। সবাই তাদের পূর্বপুরুষদের মুখে যেসব কথা গল্পাকারে শুনেছে সেসব কথাই জনশ্রুতির মত প্রচলিত রয়েছে আজও। এ অঞ্চলগুলোর ঠিক ওপারেই বরিশাল মহাকুমা হওয়ায় এখানকার ভাষায় বাগেরহাটের ভাষার গাঁথুনি নেই বরং এখানকার ভাষা,সংস্কৃতি বরিশাল অঞ্চলেরই ওপিঠ যেন। অনেকেই বরিশাল মহাকুমার আশেপাশের এলাকা থেকে এখানে এসে আবাস গড়েছিলেন বলেও শোনা যায়। এখানকার ছায়া সুনিবিড় মায়াময় পরিবেশের মধ্যে একবার এলে এসব গবেষণার ইচ্ছে মরে যাবে বরং এখানার সাথে যেন আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এমনই এক গ্রাম সন্ন্যাসী যার নাম। কেন কি করে এ জায়গার নাম সন্ন্যাসী হল সেসব না প্রত্মতাত্বিকদের গবেষণার জন্যেই তোলা থাক না হয়। সন্ন্যাসীর এক কোণেই আম,জাম,কাঁঠাল,গাব বাগানের ভেতরে চৌচালা টিনের বড় ঘরটি রাজেন্দ্রনাথ দত্তর। তাঁর স্ত্রী,বারজন ছেলে,মেয়ে,মা,এক বিধবা বোন,ছেলে বৌয়েরা,নাতি-নাতনিরা

সব মিলেমিশে যেন এক উৎসব এর চেয়ে কোন অংশে কম নয়।  সকলের কোলাহল গহীন বাগানের ঘন নিরবতাকে সহজেই ভেঙে দেয়। বড় বাড়ি,বিশাল ৪/৫ টা পুকুর,গোয়াল ভরা গরু,গোলা ভরা ধান,বাগান ভর্তি নানা ফল এসব দেখে সহজেই যে কেউ রাজেন্দ্রনাথকে সচ্ছল এবং সুখী মনে করবে নি:সন্দেহে। সুখই বটে! চারজন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন মহাধুমধামে। বাকীরা এখনো তাঁর ঘরের লক্ষ্মী হয়েই আছে। তাঁর ছোট মেয়ে মুকুলি এখনো কোলে হঠাৎ কারো সাথে দেখা হলে বিভ্রান্তিতে পরতে হয় রাজেন্দ্র নাথ কে সবাই বলে এ তাঁর নাতনি কি না। তার বড় নাতির চেয়েও এক বছরের ছোট কি না!  এ বাড়ির সামনেই বড় একটা ঘর। যেখানে কয়েকটা হুকো বেশ কায়দা করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। রাস্তা দিয়ে যাওয়া অচেনা পথিকও কখনো অভুক্ত যেতে পারে না এ বাড়ির সামনে থেকে। এ অঞ্চলে রাজেন্দ্রনাথদের আতিথেয়তার কথা জানেনা এমন লোক পাওয়া দুষ্কর। সকাল হলে সবার আগে যার গলাটা সকলে শুনে দিন শুরু করে সে রাজেন্দ্রনাথের মা”হরি দিন তো গেল সন্ধ্যে হল পার কর আমারে”! এরপরে সারাটা দিন ধরে যেন দত্তবাড়িময় একটা কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। কেউবা ধান ভানে,কেউ বা গরু চড়ায় কেউ বা জাল ফেলে মাছ ধরে,কেউ বা ক্ষেতে তরকারি বুনছে কেউ বা উঠোনে ফুল গাছের গোড়ায় মাটি দিচ্ছে। এ বাড়ির সকলের সকল কাজের সঙ্গী হয় বয়াতি। ষাটোর্ধ বয়াতিকে দেখে হঠাৎ কেউ আন্দাজ করতে পারবে না তার বয়স। একসময় প্রচণ্ড অভাবের মধ্য থেকে তুলে এনেছে এই রাজেন্দ্রনাথ। বয়াতি এ বাড়িটাকে যেন তার অন্তরে গেঁথে নিয়েছে। এ বাড়ির সবকজন ছেলে,মেয়ে বয়াতির কোলেপিঠে চড়ে মানুষ হয়েছে। এ বাড়ির বড় গামলাভর্তি ভাত,ডাল,শিং,কৈ মাছের ঝোল,সুক্তো ছাড়া বয়াতির ক্ষিদে মেটেনি। অল্প বয়সে বিয়ে করে সংসারী হয়ে বিশাল সম্পত্তির দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ায় আর লেখাপড়া করা হয়ে ওঠেনি রাজেন্দ্রনাথের। তবে ধারাপাত,আদর্শলিপি শিক্ষায় শিক্ষিত রাজেন্দ্রনাথ যেন অন্তর থেকে শিক্ষিত। মাইল কয়েক হেঁটে নইলে একটা খবরের কাগজ পড়তে যাওয়া লোক নেহাত এই ধনী চাষিদের মধ্যে বড় একটা মেলে না। আজ লক্ষ্মী পূজো। এ বাড়ির লক্ষ্মী পূজোটা বেশ আড়ম্বরপূর্ণ হয়। পূজোর প্রসাদের আয়োজনের চেয়ে লোকজনের জন্যেই বেশী আয়োজন। এ এলাকার সমস্ত লোকজন যেন লক্ষ্মী ঠাকুর হয়ে বছরের পর বছর তাদের মনে লক্ষ্মী আসন নিয়েছে। তাই তো নারু,মোয়া,তক্তি,লুচি,খিচুরির ভাগে স্বয়ং লক্ষ্মীর চেয়ে কলিমদ্দি,তাজেন মল্লিকরা এগিয়ে অনেকটা। সকাল হতে না হতেই বুড়ির মা এসে হাজির হয় হেঁসেলের সামনে”ও বৌ আইজ তো পূজা। আমু কোনহালে?” রাজেন্দ্রগিন্নি হেসে বলে” বুড়ির মা সন্ধ্যার সময় আইয়ো” কিছুক্ষণ পরে কলিমদ্দি,তাজেন মল্লিকরাও এসে খোঁজ নিয়ে যেতে থাকেন। কখনো কেউ রাজেন্দ্র গিন্নিকে এতে এতটুকু বিরক্ত হতে দেখেন নি বরং নানা সময় ঝড়,বৃষ্টির মধ্যে লক্ষ্মী পূজো হলে ঝড়,বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ছেলেদের পাঠিয়েছে বাড়ি বাড়ি। এবছর পূজোতে শীতটা একটু বেশীই পড়ে গিয়েছে। বারবার তাড়া দিচ্ছিল রাজেন্দ্রনাথ বাড়ির মেয়ে,বৌদের।এমনভাবেই হয়তবা চলতে পারত কিন্তু বেশকিছু মাস পরের একদিন রাজেন্দ্রনাথ গেল খবরের কাগজ পড়তে সেখানে সে দেখতে পেল শেখ মুজিব নাকি ঢাকায় ভাষণ দিলেন। সবার মুখে এক কথা “দ্যাশে এইফির কিছু না হইয়া যাইবে না”। রাজেন্দ্রনাথ বলে” হয়! কি আর হইবে!মনে কয় মোগো ইদিক হইবে না কিছু”। তবু মনে ভয় হয় রাজেন্দ্রনাথের বাড়ির বৌ,ঝি তার যুবক ছেলেদের কথা ভেবে মন অজানা আশঙ্কায় কাঁপে তাঁর। খারাপ খবর বুঝিবা বাতাসের আগে ধায়। হাটফেরত লোকজনের মুখে,বৌ ঝি দের মুখে এছাড়া আর কোন কথাই নেই। সন্ধ্যেবেলায় পাশের কাপালি পাড়ার আদারি আসে এসেই তার স্বভাবসুলভ জোড়ে হাঁক দিয়ে সবাইকে সচকিত করে-কই ও রাজিন্দিরদা হোনছো কিছু? রাজেন্দ্রনাথ হঠাৎ বুঝে ওঠে না। আদারি আবার বলে”কই ও রাজিন্দিরদা লও ওপার যাই দুই হান নৌকা আনলেই মোগো হইয়া যাইবে। নাইলে পরাণ লইয়া বাচমু না মোরা”। রাজেন্দ্রনাথ ভ্রু কুঁচকে বলে ওঠে-মাতা কি গ্যাছে আদারি?বাড়িঘর, গরু,ছাগল থুইয়া যামু কোনহানে?এতদিন এই দ্যাশে বিটিশগো সময়েও তো টিক্কা আছেলাম এহন আর তিনকাল যাইয়া এককালে ঠেকছি। থো দিহি আদারি। আয় মনুর মায়রে তামাকহান হাজাইয়া দেতে কই।”তামাক খেতে খেতে উদাস দৃষ্টি মেলে তাকায় রাজেন্দ্রনাথ পূর্ণিমার চাঁদের সাথে চোখাচোখি হয় তাঁর। সে শুনেছে ভরা পূর্ণিমায় কিছু আশা করলে নাকি পূরণ হয়। আজ সে চাইছে তাই তার বাড়ির সব আর আশেপাশের সবাই যেন ভাল থাকে তার যা হয় হোক। হ্যাঁ ঈশ্বর তার কথা শুনেছিল এবং তীব্র ভাবেই শুনেছিল। বয়াতির প্রাণ কাঁদে তাঁর মনিবের জন্যে।সেও বলে-ও কত্তা লয়েন মোরা একখান নৌকা ঠিক হরমু হানে। কিন্তু কেউই কথা শোনাতে পারে না রাজেন্দ্রনাথকে। মেয়ে,জামাইয়ের চিঠি,রাজেন্দ্রগিন্নির কান্না কোন কিছুই টলাতে পারেনা রাজেন্দ্রনাথকে। মনে,মনে সেও দু একবার ভাবে কিন্তু তিলতিল করে গড়ে তোলা এই মাটির টান সে ছাড়তে পারবে কেনইবা! হঠাৎ এক সকালে খবর এল ঢাকায় নাকি প্রচুর লোক পাকিস্তানিদের হাতে খুন হয়েছে। রাজেন্দ্রগিন্নি, ছেলের বৌয়েরা সবাই কাঁদতে লাগল। রাজেন্দ্রনাথ এর সেই এক কথা- মরলে এই মাডিতেই মরমু। আরে এত চিন্তার কি আছে হেইডাই তো বুজি না। আর দশজনের যা হইবে মোগোও হেইডাই হইবে। এরপর চিন্তাভাবনা, হতাশায় কেটে যায় আরো কিছুদিন। দুর্ভাগ্য আরো ঘনিয়ে আসে যখন পাকিস্তান বাহিনীর ক্যাম্প এলাকায় গড়ে ওঠে। যেখানে আগে অনেক রাত অবধি রাজেন্দ্রনাথ এর বাড়ির সামনের বড় ঘরে হুঁকো টেনে কতরকম গল্প চলত এই আদারি,তাজেন মল্লিক,কলিমদ্দি আরো কত লোকজন মিলে সেখানে সন্ধ্যে হতে না হতেই সবাই দরজা,জানলা আটকে যেন অবরুদ্ধ হয়ে যায়। সবার মুখেই এক কথা এবার আর বাঁচার রাস্তা নেই। নাহ এমন দৃশ্য কে কবে দেখেছ! একে,একে আশেপাশের অনেকেই রাতের অন্ধকারে ভোরের আলো ফোটার আগেই দলে দলে লোকজন সব বাড়িঘর ফেলে চলে যাচ্ছে। রাজেন্দ্রনাথকে অনেকেই বলে যাওয়ার জন্যে কিন্তু মাটির টান তাকে বাঁধা দেয়। আস্তে আস্তে গ্রামে শান্তি কমিটি গঠন হয়। শান্তি কমিটি কি অনেকেই বোঝে না। শুধু দেখে বেশকিছু লোক যাদের সাথে রাজেন্দ্রনাথের সেই কতকাল আগে থেকেই সখ্যতা তারাও দেখে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সহযোগী হিসেবে কাজ করে! সে ভেবে পায় না এসব বিষয়ের কূল। যারা আমাদের দেশের শত্রু তাদের সাথে কেন ওরা যাবে এ প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পায় না। কিছুদিন পরের এক সন্ধ্যেবেলা চাঁদ,তারারা ততক্ষণেও উঁকি দিয়ে দত্তবাড়ির উঠোন রাঙায় নি।কেবল ঘরের এক কোণে সন্ধ্যারতি হচ্ছে আরেক কোণে ধারাপাত,আদর্শলিপির সুরে সুরে মুখরিত হচ্ছে “দু এক্কে দুই,দুই দুগুণে চার,ক আ কারে কা,ক রস্যি কারে কি” ঠিক এমন সময় দেখল তিনচারজন লোক এল দত্ত বাড়ির ভেতর। এরা রাজেন্দ্রনাথ এর চিরচেনা লোক। এদের দেখে মোটেই বিচলিত না হয়ে বরং তামাক সাজিয়ে দিতে বলল এদের। তারা মোটেই ওসবের তোয়াক্কা না করে বলল “থোও তোমার তামাক। ওইয়া তুমই খাও। মোগো উফরে অডার আছে। তোমাগো হগোলডির মোসোলমান হওয়া লাগবে। মচ্ছিদে নামাজ পড়া লাগবে। আর গরু খাওয়া লাগবে। বৌরা কেউ যদি সিন্দুর পরে। তোমাগো কিসব পূজা ওইয়া দেয় হেইলা পরাণে বাঁচথারবা না কিন্তু।” বলেই তাদের শত বছরের পুরনো ঠাকুর ঘর আছাড় দিয়ে পদদলিত করল।মুহূর্তেই তুলসি মঞ্চ যেখানে আলো না দিয়ে কোন শুভ কাজ হয়নি এ বাড়িতেই সেটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। রাজেন্দ্রনাথ  হা করে তাকিয়ে রইল। সে যেন আচমকা কিছুই বুঝতে পারছে না। ঘর থেকে ছেলেরা দৌড়ে এসেছে। তারাও থ হয়ে গেল পুরো। কি হচ্ছে তাদের সাথে কেউ যেন কিছু বুঝতে পারছে না। তারা তিন দিন সময় দিয়ে চলে গেল। বয়াতি রাতে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে এল -কত্তা হাম্মেরে আগেই কইছেলাম। এই বিলে হইবে জানতাম। রাজেন্দ্রনাথ কোন উত্তর দিল। আজ তাঁর বলার কিছুই নেই। যে মাটির টানে সে কোথাও যায় নি। সে মাটির প্রতিদান তাকে চুপ করিয়ে দিয়েছে। পরদিন সকালে কলিমদ্দি এসে বলল” রাজিন্দির খবর পাইছি মোহান্মদ কাজী এই সব হরাইছে। হে বোলে তোমার জাগা,জমি হাত হরতে চায়।” কোন কথায় আর কোন উত্তর নেই রাজেন্দ্রনাথের। নির্বিকার হয়ে গিয়েছে রাজেন্দ্রনাথ। খানিকপরেই  আদারি কাঁদতে কাঁদতে এসে রাজেন্দ্রনাথকে জড়িয়ে ধরে বলল “রাজিন্দিরদা আগেই কইছেলাম কতা তো হোন নায়। এহন তোমার কিছু হইলে মোরা যামু কোনহানে? এই কান্না আরো দীর্ঘতর হয় বাড়ির সবাই কান্নায় একাত্ম হলে। তখনো রাজেন্দ্রনাথ। বড় নাতি দিপুর দিকে হঠাৎ চোখ পড়ল রাজেন্দ্রনাথের। এবার বুকটায় তার তীব্র ব্যথা হল। নাতিকে জড়িয়ে তীব্র কান্না ভেঙে পড়ে রাজেন্দ্রনাথ। মনে হল এই ছোট্ট মা মরা শিশু মাত্র তিন বছর আগে মাকে হারিয়েছে কলেরায় এখন এর প্রাণও কি না চলে যাবে তাও তার দাদুর জন্যে! আর কোন কিছু না ভেবে দ্রুত দৌড়ে যায় তাজেন মল্লিক এর কাছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে ও” তাজেন ভাই আও এদিক আও মোরা কেউ বাচমু না। মোগো এট্টু বাঁচাও। কলেমা শিখাইয়া দ্যাও। কয়ডা টুহি দ্যাও। ” বলেই জ্ঞান হারাল রাজেন্দ্র। তাঁর হোমিওপ্যাথি জানা বড় ছেলেও এর কোন কূল,কিনারা করতে পারল না সেও যে নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছে ঘটানার ঘনঘটায়। রাজেন্দ্রগিন্নীকে দেখে কেউ আর বলেনি স্বাভাবিক কোন মানুষ। সে শুধু এই বলেই বিলাপ করছিল” মায়,বাপে এগার বচ্ছর বয়সে বিয়া দেছেলে। কইয়া দেছেলে এই শাঁখা, সিন্দুর লইয়া জীবন। আইজ স্বামী বাইচ্চা থাইক্কাও এই অবস্তা হইলে ও গোপাল মোরে রাখলা কিসের লইগ্যা। ও ঠাকুর নেও মোরে।” ওদিকে ক্যাম্পে বিকেলে মিটিং বসে। রাজাকার মোহান্মদ কাজীর নেতৃত্বে সব কাজ হচ্ছে। সে সবাইকে নির্দেশ দিচ্ছে। বলছে” রাজিন্দির কয় বচ্ছরে ত্যালাইছে বেশি। হালা মালাউননের বাচ্চারে এইফির দেইক্কা লমু। এতডি গুড়াগাড়া হেইয়ারপরও হের জাগাজমির বাহার হইছে। এই জাগাজমি হইবে সব মোগো। আর উল্ডা নোমোডিরে মোছোলমান বানাইয়া ছোয়াব পামু”! বলেই পৈশাচিক হাসি হাসে মোহান্মদ কাজী আর তার দলের সবাই। রাজেন্দনাথের বিধবা বোন শুধু এই বলছিল কেন তার স্বামীর সাথে তারও সহমরণ হল না। রাজেন্দ্র নাথের মা বলছিল “ও হরি তোমারে তো ডাহি মুই। মোর দিন তো গেছে। এইয়া দেহাইতে বাঁচাইয়া রাখছো ক্যা!” দত্ত বাড়ি যেন শোকের বাড়িতে পরিণত হল। কে বলবে এই বাড়িতেই এক সময় প্রতি কোণ প্রাণের স্পন্দন ছিল। সবশেষে বুকে পাথর বেঁধে রাজেন্দ্রনাথ জানিয়ে দিল তারা এখন মুসলমান। সে মসজিদে যাবে। রাজেন্দ্রগিন্নী পথের পাগলের মত করতে লাগল। বাড়ির মেয়েরা এক একটা যেন জীবন্ত মৃতদেহ। এমন করেই চলছিল। হঠাৎ কিছুদিন পর জমির দলিল চাইতে এল দলবল নিয়ে মোহান্মদ। কিন্তু রাজেন্দ্রনাথ বলল সে দলিল তার কাছে নেই। ঘরবাড়ি লন্ডভন্ড করে খুঁজল মোহান্মদ কাজীর দলবল। কিছু না পেয়ে বড় করে শাসিয়ে গেল রাজেন্দ্রনাথকে যে এর শেষ ওরা দেখবে। এর একমাস পরে এক সকালে নাতি দিপুকে নিয়ে রাজেন্দ্রনাথ চলল তার ক্ষেতের কাছে। ক্ষেতের দিকে রাজেন্দ্রনাথকে লক্ষ্য করে এল মোহান্মদ কাজীর দলের ছহু। সাঁকোতে পা দিল রাজেন্দ্রনাথ ক্ষেতে ফসল ফলিয়ে ঘরে তুলবে সে। কিন্তু হঠাৎ দুটো বিকট শব্দ। শিশু দিপু কিছু বোঝার আগেই তার দাদুর নিথর দেহ লুটিয়ে পড়ল সাঁকো বেয়ে নিচে। রক্তে লাল হল রাজেন্দ্রনাথের টান যে মাটির জন্যে সেই মাটি। পরদিন মোহান্মদ কাজীর আখড়া যেন আনন্দে মেতে উঠল আরো যুক্তি হল এই আনন্দের মাত্রা দ্বিগুণ করতে দত্ত বাড়ির যুবতী, কিশোরী মেয়ে,বৌদের তুলে আনলে বেশ হয়। এরপরের সূর্যাস্তের আগে রাজেন্দ্র যে মাটির টানে কোথাও যায় নি সে মাটি আকড়েই মাটিতেই ঠাঁই নিল। আর বাকীরা অজানার পথে পাড়ি জমাল। ওরা চেয়ে আছে শূণ্যে দেখছে শুধুই অন্ধকার।

৩. একটি অলাভজনক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গল্প ও আমার জীবন

মোঃ ময়নুল ইসলাম

বছরটা ছিল ২০১২। আমি তখন ভার্সিটিতে দ্বিতীয় বর্ষের পরিক্ষা শেষ করেছি। পরিবারের আর্থিক দিক বিবেচনা করে ও নিজে কিছু করার লক্ষে পারি দেই স্বপ্নের শহর ঢাকাতে। প্রথম অবস্থায় ঢাকা গিয়ে পুরো অন্ধকারে ছিলাম। জীবনে প্রথম ঢাকা গিয়েছি। অনেক জায়গায় ঘুরার পর কোথাও কোনও চাকরি পেলাম না। বাড়ি থেকে সাহস পেলাম চাকরি না পেলেও যেন সহজে বাড়ি না যাই। টাকা পয়সা ওনারা বাড়ি থেকে দিবে। অনেক ঘুরার পর একদিন এক গার্মেন্টস এর জিএম স্যার এর সাথে কথা হয়। উনি জানতে চাইলেন আমি কোথা থেকে এসেছি। সব ডিটেইলস শোনার পর উনি বললেন পড়ালেখাটা শেষ করে আস। স্যার এর সাথে অনেক কথা বলার পর স্যার আমাকে পছন্দ করে ওনার পার্সোনাল বায়িং হাউজে চাকরি দিলেন। অনেক ভালোয় যাচ্ছিল দিন। কিন্তু আমার একধরণের ইচ্ছা করত দেশের জন্য কিছু একটা করার জন্য।

একদিন রাতে কথা হয় আমার ফুফার সাথে। তিনি আমার সব শুনে আমাকে বাসায় ডাকলেন। আমি ঢাকা উত্তরা থেকে শ্যামলীতে ওনার বাসায় গেলাম। ওনার চাকরি করা প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা হচ্ছিল। সব শুনার পর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। শুরু থেকে সব জানতে চাইলাম।

বললেন, আমি যেখানে কাজ করি তা হল একটি অলাভজনক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যিনি নিজের কথা না ভেবে দেশের মানুষের কথা ভেবে দিন রাত কাজ করে যাচ্ছে। যার জন্ম হল বিদেশের মাঠিতে। বিদেশেই পড়ালেখা। কিন্তু এখন দেশের মানুষের জন্য বস্তিতে পরে আছেন।

আমি বললাম কিভাবে?? তিনি বললেন, তিনি একদিন দেশে এসে রায়ের বাজার বস্তি দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে দেখলেন কয়েকজন বাচ্ছা নোংরা ছিঁড়া কাপর পরে রাস্তার ডাসবিন থেকে কি জানি খুজতেছে। তখন তিনি থামলেন ও বাচ্ছাদের সাথে কথা বললেন। বাচ্ছারা বলল, তারা স্কুলে যায় না। আর তারা এখান থেকে ভাঙরি সংগ্রহ করে বিক্রি করে তার পর চাল কিনে খাওয়া করে। তাই কাজে না আসলে তারা খাবে কি?? সব শুনে তিনি নিজেকে আটকে রাখতে পারলেন না। তিনি তার বন্ধুদের নিয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা করলেন। অবশেষে তিনি ভাবলেন, এখানে একটা রুম নিয়ে বাচ্ছাদের পড়া লেখা করাবেন। যেইনা ভাবা তেমন এ কাজ শুরু হল। একটা রুম নিয়ে প্রথম ১৭ জন বাচ্ছা নিয়ে শুরু হয়ে গেল স্কুল। প্রথম অবস্থায় সপ্তাহে কয়েকদিন ক্লাস নেওয়া হত বিভিন্ন আননদ ও খেলার সাথে। এর পর দেখা গেল অনেকেই আসছে না। কারন তারা জানাল বাবা মা বলেছে পড়া লেখা করে কি হবে?? তুমি কাজে যাও। তাই তারা স্কুল আস্তে পারছে না। তার পর তাদেরকে স্কুল মুখি করার জন্য সপ্তাহে চাল দেওয়া শুরু করল। এভাবে চলতে চলতে একদিন বাচ্ছারাই জানাল তারা চাল ও ডাল চায় না। তারা বই চায় ও পড়তে চায়। তার পর থেকে শুরু হয়ে গেল তাদের ক্লাস।

এই স্কুলের গল্পটা ছিল ২০০৭ সালের। আমি আবার আমার ফুফাকে জিজ্ঞেস করলাম, এখন ২০১২ তে এসে কি অবস্থা। তিনি জানালেন অনেক ভালো। খুব ভালো লাগছে সুবিধা বঞ্চিত বাচ্ছা ও অবিভাবকদের সাথে কাজ করে। আমি আগ্রহ প্রকাশ করলাম একটু ঘুরে দেখার। উনি বললেন সময় করে একবার আস নিয়ে যাব। ঠিক সময় করে একদিন চলে গেলাম ও ওনার সাথে স্কুলে চলে গেলাম। গিয়ে পুরো অফিস ঘুরে ও স্কুল দেখে আমি পুরো অবাক হয়ে গেলাম। যেখানে প্রতিটা ক্লাস এ বাচ্ছারা ক্লাস করতেছে। সাথে কিছু সুবিধা বঞ্চিত মানুষের বিভিন্ন কাজের কারখানা। সেখানে তারা কাজ করতেছে। বাইরে সুবিধা বঞ্চিত বাচ্ছাদের গেম ও কম্পিউটার ব্যাবহারের সুবিধা আছে। সব থেকে আবাক লাগছে পরিবেশ দেখে। যেখানে এক বিন্দু মাত্র কারো চোখে হতাশা দেখতে পাই নাই। সবার চোখ ভরে শুধু রঙ্গিন স্বপ্ন ছিল।

অফিসে বসে বিভিন্ন জনের সাথে কথা হচ্ছিল। আমি জানতে চাইলাম। এতো বাচ্ছার পড়ালেখার খরচ ও সপ্তাহের হাইজিন পণ্য ও পুস্টিকার খাবার এর খরচ আসে কোথা থেকে। তিনি বললেন সব স্পন্সরস ও বিভিন্ন অনুদানের মাধ্যমে। পুরো প্রছেস টা বলে দিলেন। প্রতি বাচ্ছার জন্য একজন করে স্পন্সরস আছে। যারা হলেন বাচ্ছার দ্বিতীয় অভিভাবক। তারা বাচ্ছার সব খরচ দিয়ে থাকে।

ওখান থেকে ফিরে আমি অনেক ভেবে দেখলাম। দেশের জন্য কিছু করতে হলে এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠান টি অনেক বেটার। যেই ভাবা সেই কাজ। ফুফাকে বলে দিলাম সার্কুলার হলে জানাতে। তার পর ২০১২ সালের ডিসেম্বর এ নতুন ব্রাঞ্ছ খোলার জন্য একজন প্রোজেক্ট অফিসার এর নিয়োগ হল। আমি অ্যাপ্লাই করলাম ও পরিক্ষা দিলাম। আমাকে সিলেক্ট করে নিয়োগ দেওয়া হল রাজশাহী ব্রাঞ্ছ এর জন্য।

এর মাঝে স্যার, আমাকে বললেন তুমি এখানে থেকে যাও। তোমার ভবিষ্যৎ এখানে অনেক ভালো আছে। তুমি বুঝছ না তোমাকে ভালো বেশে কোথায় নিয়ে এসেছি। তখন স্যার কে সব খুলে বললাম। স্যার বুঝতে পারল ও বলল ঠিক আছে যাও। তবে আমার প্রয়োজন হলে আমাকে কল দিয়ো।

২০১৩ সাল থেকে রাজশাহী ব্রাঞ্চে কাজ করে আসছি। এখানে কাজ করে জানতে পারতেছি আসলে মানুষ মানুষের জন্য এগিয়ে না আসলে এই দেশ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। দেশের একটা অংশ এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। আমাদের সবার এগিয়ে আসা দরকার।

২০০৭ সাল থেকে ২০২১ সালে এই অলাভজনক অর্গানাইজেশন এর ব্রাঞ্ছ এখন ১২ টি। যেখানে এখন ৩ থেকে ৪ হাজার সুবিধা বঞ্চিত বাচ্ছারা ফ্রি ইংলিশ ভার্সন এ পড়া লেখা করতেছে। যাদের পড়া লেখার জন্য একটি পয়সা ও খরচ করতে হয় না। যাদের ফ্রি ব্যাগ, বই, খাতা, ড্রেস, জুতা, এস্টেশনারি সব দেওয়া হয়। যেখানে এখন অনেক বেকার যুবক কাজ করতেছে। যা এখন অনেক মানুষের অনুপ্রেরনার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যিনি এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছেন তাহার নাম হলঃ স্যার, করভী রাখসান্দ ধ্রুব। তিনি একজন বাংলাদেশী। বাংলাদেশেরই একজন যুবক। আর প্রতিষ্ঠানটির নাম হল জাগো ফাউন্ডেশন। যার নাম হয়ত আপানারাও জানেন। যার নাম এখন শুধু বাংলাদেশ না পুরো বিশ্ব ও জানে। কারন এখন জাগো ফাউন্ডেশন এর অনেক নাম ডাক। ২০০৭ সাত সালের একজন বাচ্ছা এখন আমেরিকায় এ স্কলারশিপ পেয়ে ফ্রি পড়া লেখা করতেছে।

অনেক অ্যাওয়ার্ড ও পেয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল স্কুল হল জাগো ফাউন্ডেশন স্কুল। বাংলাদেশে প্রথম জাগো ফাউন্ডেশনই অনলাইনে ক্লাস নেয়। যেখানে ঢাকায় বসে বান্দরবনসহ সারা বাংলাদেশের সব ব্রাঞ্চে অনলাইনে পড়া লেখা করা হয়।

যে বাচ্ছা গুল একদিন ডাসবিনের ময়লার মাঝে তাদের তিন বেলার শুধু খাবারের স্বপ্ন দেখত। আজ তারা এখন আমেরিকায় পড়া লেখা করছে। সবাই স্বপ্ন দেখছে, কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ শিক্ষক, কেউ বড় কোনও সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার।

কে তাদের এই স্বপ্ন দেখাল। একজন সাধারন বাংলাদেশের যুবক। যার মাঝে দেশ প্রেম, দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসায় সম্ভব হয়েছে। চাইলেই তিনি এসব চিন্তা না করে বিদেশে অনেক ভালো ভাবেই লাইফ লিড করতে পারতেন। কিন্তু না করে দেশের কথা ভাবছেন। দেশের মানুষের কথা ভাবছেন। আমরা দেশের জন্য কিছু করতে পারি। শুধু একটু শক্তি, সাহস, দেশ প্রেম থাকলেই হবে। তাহলে কোনও না কোনও ভাবেই আমরা সফল হব।

আজকের এই গল্পটা থেকে চাইলেই আমরা অনেক কিছু শিক্ষা নিতে পারি। আমি জাগো ফাউন্ডেশন সম্পর্কে খুব সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরেছি। আসলে এরকম প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বলতে গেলে বলা শেষ হওয়ার মত নয়।

আমি যেখানে কাজ করতেছি সেখানের বিস্তারিত বলতে গেলে ও এতো কম সময়ে শেষ করা যাবে না। শুধু এতো টুকুই বলি। লাখো টাকার মাঝে একক ভাবে স্বপ্ন না দেখে এই মানুষ গুলোকে সাথে নিয়ে স্বপ্ন দেখা হাজার গুনে ভালো। বিশ্বাস না হলে একবার নিজেই এই মানুষের পাশে দাঁড়ান সব বুঝতে পারবেন।

Facebook Comments
সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

আরও দেখুন

অনুরূপ লেখা গুলো

Back to top button
Close
Close