যানবাহন

২০২০ সালে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল কেনাবেচার প্রবণতা এবং ২০২১ এর প্রত্যাশা

গত দুই দশকে দেশের মোটরসাইকেলের বাজার বেশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের মত ক্ষুদ্র আয়তন অথচ জনবহুল একটি দেশে মোটরসাইকেলের মত একটি যান মানুষ সহজেই গ্রহণ করে নিবে এটি অনুমেয়। শহর অথবা গ্রামাঞ্চলে মোটরসাইকেলের ব্যাপক চাহিদা, অপেক্ষাকৃত কমদামে ক্রয়ের সুযোগ, এবং দেশীয় মোটরসাইকেলের ব্র্যান্ডগুলোর প্রসারের কারণে দিন দিন এই বাজার বড় হচ্ছে।  

২০০০ সালের শুরুর দিকেও একটি নামী ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল কেনার জন্য প্রায় ২ লক্ষ টাকার প্রয়োজন হত। অথচ আজকের দিনে কিছু ১৫০সিসি মোটরসাইকেল ১-১.৫ লক্ষ টাকায় অনায়াসে পাওয়া যায়। আবার ব্যবহৃত হলে সেটি ১ লক্ষ টাকার কমেও পাওয়া সম্ভব!

Bikroy.com-এ আমরা মোটরসাইকেলের মূল্য হ্রাসের মূলত দুটো কারণ খুঁজে পেয়েছি। প্রথমত দেশীয় বাইক গুলোর জন্য মূল্য সংযোজন করের পরিমাণ কমে গেছে এবং দ্বিতীয়ত, কোম্পানিগুলোর বিস্মৃত বিপণন কৌশলের জন্য সহজেই ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হচ্ছে। এমনকি মালিকেরাও মোটরসাইকেল এবং স্কুটারের সবচেয়ে বড় মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে তাদের দুই-চাকার যানটি পছন্দসই দামে এবং অল্প সময়ের মধ্যে বিক্রি করতে সক্ষম হচ্ছেন। 

২০২০ সালে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল কেনাবেচার প্রবণতা 

Bikroy.com-এর তথ্যানুযায়ী ২০২০ সালের শুরুটা বেশ স্বাভাবিক ভাবে হলেও মার্চ মাস থেকে কোভিড-১৯ এর কারণে মোটরসাইকেল কেনাবেচার বাজারে প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করে। প্রায় তিন মাস স্থবির অবস্থায় থাকার পর জুন মাস থেকে বাজার ফিরতে শুরু করে তার পুরনো ছন্দে। 

করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও বাজারে মোটরসাইকেলের চাহিদা ভালো হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে উৎপাদনের শর্ত সাপেক্ষে মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া, বড় শহরগুলোতে রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যাপক প্রসার, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে উঠে আসা সহ বেশ কিছু।

মাস ভিত্তিক মোটরসাইকেলের ক্রেতা এবং বিক্রেতা

বাংলাদেশে জনপ্রিয় মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডসমূহ 

২০২০ এর পুরোটা সময় জুড়েই দেশে মোটরসাইকেলের বাজার ওঠা-নামার মধ্যে ছিল। করোনা মহামারির পরবর্তী অর্থনৈতিক সফলতা এবং মধ্যবিত্তদের ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার কারণে তা আবার বর্তমানে ভালো পরিস্থিতির দিকে। 

নীচের গ্রাফটি আপনাকে বাংলাদেশে জনপ্রিয় মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডগুলোর ব্যাপারে একটি স্বচ্ছ ধারণা দিবে। একইসাথে আপনি বুঝতে সক্ষম হবেন কেন জাপানী মোটরসাইকেল কোম্পানিগুলো সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। বর্তমানে মানুষ মূলত সচরাচর মূল্য, যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা, পর্যাপ্ত সার্ভিসিং সেন্টার, ইত্যাদি কথা মাথায় রেখে ব্র্যান্ড পছন্দ করে।   

দেশের বাজারে প্রায় ছয়টি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে- এর মধ্যে রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের টিভিএস, হিরো, এবং বাজাজ মোটরস এবং জাপানীজ ব্র্যান্ড ইয়ামাহা, সুজুকি, এবং হোন্ডা। এর পাশাপাশি দেশের মানুষকে নিরন্তর সেবা প্রদান করে যাচ্ছে আমাদের একমাত্র দেশীয় ব্র্যান্ড রানার মোটরস। 

Bikroy.com-থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের জনপ্রিয় মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড সমূহ

বাংলাদেশের জনপ্রিয় মোটরসাইকেল মডেলসমূহ

দেশের মধ্যবিত্তদের ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার ফলে মোটরসাইকেল ট্রেডিং বাজারেও তার ছাপ স্পষ্ট। তুলনামূলক কম দামের কারণে ভারতীয় মোটরসাইকেলের বিক্রি এবং জনপ্রিয়তা দানবীয় আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি রাইড শেয়ারিং পরিষেবার উতরোত্তর ব্যবহার বাংলাদেশে মধ্যম দামের মোটরসাইকেল মডেলগুলোর চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যাপক আকারে। 

Bikroy.com থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ২০২০ সালে বাংলাদেশে সর্বাধিক ট্রেডিং হয়েছে বাজাজ কোম্পানির পালসার মোটরসাইকেলটির। এর পরপরই আছে টিভিএস অ্যাপাচি এবং বাজাজের ডিসকভার মডেলটি। হিরো মটোকর্পসের হাংক এবং সুজুকি জিক্সার রয়েছে যথাক্রমে তৃতীয় এবং চতুর্থ অবস্থানে।   

Bikroy.com-থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের জনপ্রিয় মোটরসাইকেল মডেল সমূহ

 ইন্টারনেটে সর্বাধিক খোঁজা মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডসমূহ 

জাপানিজ মোটরসাইকেল কোম্পানি ইয়ামাহার একটি গবেষণা মতে, বাংলাদেশে প্রতি ১৫০ জনে ১ জন মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী। যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সংখ্যাটি ৪০০ এর কাছাকাছি। যা থেকে সহজেই অনুমেয় যে আমাদের দেশের মোটরসাইকেলের বাজার কতখানি সম্ভাবনাময়।  

Bikroy.com-থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ইন্টারনেটে সর্বাধিক অনুসন্ধানকৃত মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে হোন্ডা মোটরস, ইয়ামাহা, সুজুকি, টিভিএস এবং বাজাজ মোটরস।   

Bikroy.com-এ সর্বোচ্চ সার্চ করা মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড এবং মডেল সমূহ

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল কেনাবেচার মূল্য পরিসীমা

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মোটরসাইকেল ক্রয়সীমার আয়ত্তের ভেতরে আসতে শুরু করেছে যা ত্বরান্বিত করছে দেশের মোটরসাইকেল কেনাবেচার বাজারকে। সম্পূর্ণ পরিসরকে মোটা দাগে সাত ভাগে ভাগ করার পরে আমরা লক্ষ করেছি ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকার ভেতরে প্রায় ৩৩ শতাংশ ট্রেডিং হয়েছে অর্থাৎ এই বাজেটের ভেতরে সর্বাধিক মোটরসাইকেল কেনাবেচা হয়েছে । 

১৩ শতাংশ জায়গা নিয়ে এই রেঞ্জের দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ৩০-৫০ হাজার টাকার মধ্যে ক্রয় ও বিক্রয় হওয়া বাইকগুলো এবং ১২ শতাংশ আছে ১.৫-২.৫ লক্ষ টাকা পরিসীমার মধ্যে বাইকগুলো। 

মোটরসাইকেলের দামের ভিত্তিতে নির্নয়কৃত সহজলভ্যতা

বাংলাদেশের বাজারে কেনাবেচা হওয়া বাইকগুলোর অবস্থা

২০২০ সালে  Bikroy.com-এর মাধ্যমে মোটরসাইকেল কেনাবেচার তথ্যানুযায়ী, মোট বাইকের ৮৬ শতাংশই ছিল ব্যবহৃত অন্যদিকে ১৪ শতাংশ ছিল নতুন মোটরসাইকেল। বাজেটবান্ধব হওয়ার কারণে দেশের বাজারে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের কেনাবেচা বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

অনেকসময় ক্রেতারা নতুন মোটরসাইকেল কিনতে ইচ্ছুক হলেও লোন পাওয়ার জটিলতা তাদের সেটি কিনতে অনুৎসাহিত করে। ছাত্রদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সহজে লোন না পাওয়া এবং নতুন বাইকের দামের কারণেই অনেকে পুরাতন বা ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কেনার দিকে ঝুঁকছেন। 

Bikroy.com-এ নতুন এবং পুরাতন মোটরসাইকেলের পার্থক্য

শহরভেদে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের লিস্টিং 

শহুরে রাস্তায় দুবির্ষহ ট্র্যাফিক এবং রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলোর উত্থান শহরাঞ্চলে মোটরসাইকেলের চাহিদা দিন দিন বাড়িয়েই চলেছে। ২০২০ সালে Bikroy.com- এর তথ্যানুযায়ী ঢাকা শহরেই প্রায় ৫৫ শতাংশ মোটরসাইকেল কেনাবেচা হয়েছে এবং এর পরেই আছে চট্টগ্রাম যেখানে মোট কেনাবেচার ১৭ শতাংশ হয়েছে। 

Bikroy.com-এ শহর ভেদে মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপন

শেষকথা

মোটরসাইকেল শিল্প সম্প্রসারণের লক্ষে বিগত কিছু বছর ধরেই সরকার শুল্ক করে ছাড় দিয়ে আসছে। ফলে সমগ্র দেশ জুড়েই বাড়ছে মোটরসাইকেলের বাজার। বিদেশী বিভিন্ন কোম্পানির সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে দেশে উৎপাদিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা। 

বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের চাহিদা বেড়ে চলার কারণে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও দেশের ভেতরেই তাদের মোটরসাইকেল উৎপাদন এবং সংযোজনের পরকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি জ্বালানী তেলের উর্ধ্বগতি রোধের উপায়, মোটরসাইকেল উৎপাদনে শর্ত তুলে দেওয়া, এবং মোটরসাইকেল কেনার জন্য লোনের সুবিধা প্রদান করতে হবে। 

Facebook Comments
সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

আরও দেখুন

অনুরূপ লেখা গুলো

Back to top button
Close
Close