শখ, খেলাধুলা এবং শিশু

ফিট থাকার জন্য এই ৪টি অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন

শারীরিক সুস্থতা কে না চায়? কিন্তু শরীরকে ফিট এবং মেদহীন রাখতে যে পরিশ্রম এবং নিয়ম-কানুন মেনে চলা দরকার তা অনেকেই করতে চান না। অতঃপর স্থূলকায় দেহ এবং সেই দেহে নানান রোগের বসবাস, যেটা কারোরই কাম্য নয়। আমাদের কর্মব্যস্ত জীবনে স্বাভাবিক কাজের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর উপায়গুলো মেনে চলার সময় খুব কম মানুষেরই আছে। প্রতিদিনের জীবনযাপনে একটু একটু পরিবর্তনের মাধ্যমে কিন্তু সহজেই সেটা করা সম্ভব হয়। আজ আমরা কী কী উপায় অবলম্বন করে ফিট থাকা যেতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করবো।

খাদ্যাভাস

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে – “We are what we eat”। অর্থাৎ, আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি আমরা তেমনি। কত সরল কিন্তু শক্তিশালী একটা উক্তি। অথচ সামনে লোভনীয় খাবার আসলে আমরা সংবরণ করতে পারি না। আমাদের শরীরকে ঠিকমতো কাজে লাগানোর জন্য যতটুকু খাবার খাওয়া দরকার তার অতিরিক্ত খেলেই জমে যায় মেদ। তাই সবার আগে নিজের জিহ্বায় লাগাম টানতে হবে। বর্তমান সময়ে ফাস্ট ফুড অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও এগুলো শরীরের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। তাই একান্ত প্রয়োজন ছাড়া এসব খাবার না খাওয়াই উত্তম। এছাড়াও প্রসেসড ফুড, টিনজাত, চিনিজাত, লবণাক্ত, সোডা বা কার্বোনেটেড বেভারেজ ইত্যাদি খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। ঘরে তৈরি সুষম খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস করুন। অর্থাৎ কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন – খাবার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না কোনো কিছুই। পাশাপাশি যথেষ্ট পরিমাণে শাকসবজি এবং ফলমূল খেতে হবে। একটা ব্যালান্সেড ডায়েটের জন্য সব ধরণের খাবারের কম্বিনেশন খুবই জরুরি। তাই এসব পুষ্টির উৎস এমন খাবার যেমন ভাত, রুটি, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, বাদাম, বীজ, তেল বা ঘি খেতে হবে প্রতিদিন, একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে। আর তার সাথে পান করতে হবে প্রচুর পরিমাণ পানি। পুষ্টিবিদদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। যারা ওজন কমাতে বা ধরে রাখতে চান তাঁরা কেবল খাবার আগে এক গ্লাস পানি পান করেই সেটা করতে সক্ষম হবেন। পানি পান করতে ভুলে গেলে ব্যবহার করতে পারেন অ্যালার্ম।

ব্যায়াম এবং মেডিটেশন

শুধু সঠিক খাবার খেলেই হবে না। সুস্থ থাকতে চাই ব্যায়াম বা শরীরচর্চারও। আমরা প্রতিদিন যতটুকু ক্যালোরি গ্রহণ করছি, ততখানি বার্ন বা ঝরিয়ে ফেললেই আর ওজন বাড়ার সম্ভাবনা থাকে না। আর একটু বেশি ক্যালোরি ঝরাতে পারলেই ওজন কমতে শুরু করবে। সময়ের অভাবে জিমে যাওয়া হচ্ছে না সেই অজুহাতের দিন শেষ। অনলাইন টিউটোরিয়াল ভিডিও দেখে ফ্রি হ্যান্ড বা ঘরে থাকা ফিটনেস সরঞ্জাম দিয়েই সেরে ফেলতে পারেন হোম ওয়ার্কআউট। আবার চাইলে বাসায়ই তৈরি করে ফেলতে পারেন হোম জিম। দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে পারেন। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাটার চেষ্টা করতে পারেন। সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো আর বিভিন্ন খেলাধুলার সাথে সম্পৃক্ত থাকলে তা খুবই উপকারী। নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীর-মন দুটোই চনমনে থাকবে আর জমতে পারবে না অতিরিক্ত মেদ। ফিট থাকার ক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতাও একটা বড় প্রভাব ফেলে। আর সেজন্য করতে পারেন যোগব্যায়াম, ধ্যান বা মেডিটেশন। ধর্মীয় প্রার্থনাও এক ধরণের মেডিটেশন। এতে করে মানসিক প্রশান্তির পাশাপাশি কাজে মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়বে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।

পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রাম নিন

সারাদিন কাজের পর আমাদের শরীর চায় বিশ্রাম। নিরবিচ্ছিন্ন ঘুমের মাধ্যমে শরীর তার সারাদিনের ধকল কাটিয়ে উঠে আমাদের পরবর্তী দিনের জন্য প্রস্তুত করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কমপক্ষে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে বিভিন্ন শারীরিক এবং মানসিক রোগব্যাধি দেখা দিতে পারে। তাই কোনোভাবেই ঘুমের সাথে আপোষ করা যাবে না। ঘুমের সমস্যা থেকে থাকলে নিচের টিপসগুলো মেনে চলতে পারেনঃ

  • প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাবার এবং ঘুম থেকে উঠার চেষ্টা করুন।
  • ঘুমাতে যাবার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে সকল ধরণের ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস যেমন মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার, টিভি ইত্যাদি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। এগুলোর ক্ষতিকারক রশ্নি আমাদের ঘুমকে ব্যাহত করে।
  • শোয়ামাত্র ঘুম না আসলে বই পড়ে দেখতে পারেন। তাড়াতাড়ি ঘুম আসবে।
  • একদম অন্ধকার ঘরে ঘুমানোর চেষ্টা করুন যেখানে কোনো রকম বাহ্যিক শব্দ আসে না।
  • প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে দাঁত মেজে, ঢিলেঢালা পোশাক পরে, চুল বেঁধে পরিপাটি হয়ে নিন।
  • সম্ভব হলে চটজলদি হট শাওয়ার সেরে নিতে পারেন। আর বিছানায় বা ঘরে হালকা সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারেন। এতে ঘুম ভালো হয়।  
  • রাতে বিশেষত ঘুমাতে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত পানি পান করবেন না। এর ফলে বারবার ঘুম ভেঙ্গে ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে।

ঘরের কাজ করুন

ঘরের কাজে অংশগ্রহণ হতে পারে ফিটনেসের একটি চমৎকার মাধ্যম। ঘরের কাজে সাহায্যকারী থাকলেও আপনার কিছু কিছু কাজ হবে তার জন্যও সাহায্য। ঘুম থেকে উঠে বিছানা গোছানো, নিজের কাপড় গুছিয়ে রাখা, গাছপালার যত্ন এবং বাগান করা ইত্যাদি টুকটাক কাজ থেকে শুরু করে ঘর ঝাঁট দেওয়া, ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, আসবাবপত্র মোছা ইত্যাদি কাজ আপনার শরীরকে সচল রাখতে সাহায্য করবে। আর নিজের ঘর সাজাতে আপনিই হয়ে উঠতে পারেন এক্সপার্ট! কয়েকমাস পরপর কারো সাহায্য নিয়ে আসবাবপত্রগুলো একটু নেড়েচেড়ে নিতে পারেন। ঘরেও নতুনত্ব আসলো আর আপনিও কিছু ক্যালোরি পোড়াতে পারলেন। 

বদ-অভ্যাসগুলো পরিহার করুন

আমরা স্বীকার করি আর না করি, রোজকার জীবনের বদঅভ্যাসগুলো ঠিকই আমাদের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। ধূমপান, মদ্যপান বা পান-জর্দা ইত্যাদি সেবনের মারাত্মক অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। অ্যালকোহল এবং তামাকজাতীয় দ্রব্য় আমাদের হৃদপিন্ড, ফুসফুস এবং সমগ্র শরীরের ক্ষতিসাধন করে। অতিরিক্ত মোবাইল বা ল্যাপটপের ব্যবহার আমাদের করে তুলতে পারে অলস এবং ক্লান্ত। আর দুশ্চিন্তা আমাদের করতে পারে মানসিকভাবে দুর্বল। এছাড়া কী কী বদ-অভ্যাস আপনার ফিটনেসে বাধা সৃষ্টি করছে তা চিহ্নিত করুন এবং সেগুলো বর্জন করুন। 

ফিট থাকার জন্য চাই দৃঢ় মনোবল। তাই বদ-অভ্যাসগুলোকে ভালো কিছু অভ্যাস দিয়ে পূরণ করতে পারেনঃ

  • সবসময় পজিটিভ এবং হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুন। মানসিকভাবে উৎফুল্ল থাকতে পারবেন।
  • যেগুলো আপনার আয়ত্বে নেই সে বিষয় নিয়ে অকারণে চিন্তা করা থেকে বিরত থাকুন।
  • নিজের কাজ আর ব্যক্তিগত জীবনকে আলাদা রাখুন। একটা চেকলিস্ট অনুযায়ী কাজ করুন। আজ কোনো কাজ হয়নি বলে বাড়তি চাপ না নিয়ে আগামীকাল আবার নতুন করে শুরু করুন।
  • পরিবারকে সময় দিন। তাঁদের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করুন। দিনশেষে তারাই আপনার সত্যিকারের বন্ধু।
  • মনের কথা জমিয়ে না রেখে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা পরিবারের কোনো সদস্যের সাথে শেয়ার করুন।
  • নিজের যত্ন নিন। নিয়মিত ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। কোনো নতুন হেয়ারস্টাইল করতে চাইলে নির্দ্বিধায় করে ফেলুন।
  • অবসরে এমন কিছু করুন যা আপনাকে আনন্দ দেয় এবং একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। হতে পারে সেটা রান্না করা, বই পড়া, ছবি আঁকা, গান গাওয়া বা শোনা, নাচা, বাগানের পরিচর্যা, পছন্দের কোনো মুভি দেখা, কোথাও ঘুরতে যাওয়া যেকোনো কিছু।  

পরিশেষ

ছোট ছোট অভ্যাস বদলে কীভাবে ফিটনেস ধরে রাখা যায় আশা করছি এই প্রতিবেদনটি থেকে তা বিস্তারিত জানতে পেরেছেন। আমাদের অনেকেই আছেন যারা অনেক চেষ্টার পরও ওজন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছেন না। ওজন বৃদ্ধিতে হরমোনাল ইমব্যালান্স, দীর্ঘমেয়াদি রোগ বা ঔষধ সেবন, পারিবারিক সূত্রতা, ক্ষুধামন্দা, অতিরিক্ত খাবার চাহিদা, অনিদ্রা, ডিপ্রেশন বা মানসিক অবসাদ ইত্যাদি বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এক্ষেত্রে উপরোক্ত টিপসগুলোর পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মেনে চলতে হবে। মনে রাখবেন, ফিটনেস মানে এককালীন লক্ষ্য অর্জন নয়, সুস্থ থাকার জন্য এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। নিজের প্রতি ভালোবাসা আর আত্মবিশ্বাসই আপনার সফলতার চাবিকাঠি। তাই কালকের জন্য় অপেক্ষা না করে আজই দেখুনই না কী শুরু করা যায়!

আপনার জন্য শুভকামনা।

সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

আরও দেখুন

অনুরূপ লেখা গুলো

Back to top button
Close
Close