চাকরি

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তুলবেন যে ৫টি উপায়ে

দেশের বড় এবং নামী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিরভাগ নিয়োগের সময় শুধু ডেভেলপার এবং ডিজাইনার নিয়ে থাকে এরকম একটি ধারণা অনেকের মাঝে রয়েছে। হ্যাঁ, এই নিয়োগগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ তবে দেশের বাজারে ডিজিটাল মার্কেটিং ক্রমবর্ধমান একটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিনিয়ত দক্ষ এবং নিবেদিত কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে। 

এই মুহূর্তে আপনি যদি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান তাহলে তা হয়তো আপনাকে আপনার প্রতিষ্ঠানের জন্য মার্কেটিং প্ল্যান করতে, ফেসবুকে আপনার প্রতিষ্ঠানের পেইজের অনুসারীদের সাথে সময় কাটাতে, অথবা ব্যবসার জন্য আকর্ষণীয় কপি লেখার সুযোগ এনে দিতে পারে। তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে এটাই ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ার সুবর্ণ সময়। 

তাই আজ আমরা আপনার জানার সুবিধার্থে ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কিত সকল জিজ্ঞাসা এবং কীভাবে একজন ডিজিটাল মার্কেটার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়বেন তাঁর বিস্তারিত নিয়ে এসেছি। চলুন দেখে নেওয়া যাক ক্রমশ বিকাশমান এই শিল্পে ক্যারিয়ার গড়ার গাইডলাইন এবং বাংলাদেশে ডিজিটাল মার্কেটিং চাকরির বর্তমান বাজার। 

ক্যারিয়ার হিসেবে ডিজিটাল মার্কেটিং

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে পেশাগত সম্ভাবনা অনেক বেশি। বিশেষত বর্তমানে যখন আমরা একটি ডিজিটাল সভ্যতায় বসবাস করছি এবং প্রচলিত বিপণন বা মার্কেটিং থেকে অনেকেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। 

বিখ্যাত ব্র্যান্ড এবং প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত ডিজিটাল মার্কেটিং এর মাধ্যমে তাদের প্রচারণা করছে যার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এই খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা। 

এছাড়াও ডিজিটাল মার্কেটার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার একটি অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই কাজের জন্য শারীরিক ভাবে উপস্থিত থাকাটা প্রয়োজনীয় নয়। অর্থাৎ যেকোনো জায়গায় বসেই করা এবং পাওয়া যেতে পারে আপনার কাঙ্ক্ষিত কাজ। চলুন দেখে আসা যাক যেই ৫টি উপায়ে আপনি সহজেই শুরু করতে পারবেন ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আপনার যাত্রা। 

১. নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরি করুন

ডিজিটাল বিপণন বা মার্কেটিংয়ে ক্যারিয়ার গড়তে আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অনেকগুলো সার্টিফিকেটের প্রয়োজন না হলেও, যা যা প্রয়োজন হতে পারেঃ 

  • ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আপনার দক্ষতা
  • সেই দক্ষতা ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন করার সক্ষমতা

এবং এই কাজটি করার সবথেকে উত্তম পন্থা হলো নিজের ওয়েবসাইটে নিরীক্ষা করা। অর্থাৎ আপনার ওয়েবসাইট ব্যবহার করার মাধ্যমে আপনি বিভিন্ন পরীক্ষামূলক কাজ করতে পারবেন যাতে করে অন্যের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনের সময় ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে।

এছাড়াও অন্যদেরকে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আপনার অভিজ্ঞতা এবং সাফল্য দেখানোর জন্য এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী বা হতে পারে? 

২. যেকোনো একটি মাধ্যম বেছে নিন

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বেশ কিছু জনপ্রিয় চ্যানেল বা মাধ্যম রয়েছে, যেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ 

  • সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও)
  • কন্টেন্ট মার্কেটিং
  • ইমেইল মার্কেটিং 
  • সোশ্যাল এবং ডিসপ্লে অ্যাড 

চলুন এই চ্যানেলগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেইঃ 

অনলাইন অ্যাড বা বিজ্ঞাপন 

অনলাইন অ্যাড এর মাধ্যমে গুগল, ফেসবুক, বা ইন্সটাগ্রামের মত প্ল্যাটফর্মগুলোতে অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন প্রদান করা হয়ে থাকে। আপনি যদি খুব দ্রুত আপনার ওয়েবসাইটে ভিজিটর বা ট্র্যাফিক বাড়াতে চান, অনলাইন অ্যাড এক্ষেত্রে সবথেকে কার্যকরী উপায়। 

তবে আপনি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে নতুন হয়ে থাকলে এই মাধ্যমটি আপনার জন্য নয়। অনলাইন অ্যাড মানে শুধুই এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে অ্যাড চালানো নয়; এর জন্য দরকার প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা। 

স্যোশাল মিডিয়া মার্কেটিং (এসএমএম)

স্যোশাল মিডিয়া মার্কেটিং এর মাধ্যমে মূলত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার প্রতিষ্ঠানের পেইজ বা আইডিতে অনুসারীর সংখ্যা বাড়িয়ে তাদের কাছে পণ্য/সেবার প্রচারণা করা হয়। যেহেতু বেশিরভাগ সামাজিক মাধ্যমেই ফ্রি কন্টেন্ট পোস্ট করা যায় তাই আপনি নতুন হয়ে থাকলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মাধ্যমেই আপনার প্রচারণা চালাতে পারেন। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ভালো সাড়া পেতে হোলে আপনার দেশ বা অবস্থান অনুযায়ী জনপ্রিয় মাধ্যমগুলোকেই বেছে নেওয়া উচিত। এছাড়াও জনপ্রিয় বা ট্রেন্ডিং সকল ঘটনার ব্যাপারে চোখ কান খোলা রাখতে হবে।

সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও)

এসইও করার মাধ্যমে আপনার ওয়েবসাইটের বিভিন্ন পেইজগুলোকে বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন যেমনঃ গুগল, ইয়াহু, ও বিং-এর সার্চ রেজাল্টে ভালো অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। তবে এসইও করার মাধ্যমে রাতারাতি কার্যসিদ্ধি করার কথা কল্পনা করা যাবেনা বরং দিনের পর দিন সঠিক উপায়ে পরিশ্রম এবং চেষ্টার মাধ্যমেই মিলতে পারে এসইও সাফল্য।

তবে একবার র‍্যাংকিং-এ ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারলে আপনি সার্চ ইঞ্জিনগুলো থেকে নিয়মিত অর্গানিক এবং ফ্রি ভিজিটর পাবেন।

৩. শেখার কোনো বিকল্প নেই 

আপনি যেই মাধ্যম ব্যবহার করে আপনার ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের চর্চা করছেন সেই মাধ্যম সম্পর্কে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু জানার চেষ্টা করুন। এক্ষেত্রে অনলাইনে বিভিন্ন কোর্স বা গাইডলাইন দেখে নিতে পারেন, তবে তা অবশ্যই আপডেটেড হতে হবে। 

আপনি যদি এসইও শেখা এবং চর্চার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে চান, সেক্ষেত্রে আপনাকে যা যা জানতে হবেঃ 

  • কীওয়ার্ড রিসার্চঃ কীওয়ার্ড রিসার্চিং এসইও ফ্রেন্ডলি কন্টেন্ট তৈরি করার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভালো ফলাফল পেতে আপনার ইন্ডাস্ট্রি অনুযায়ী কীওয়ার্ড রিসার্চ করে তা সঠিক উপায়ে আপনার বিভিন্ন কন্টেন্টে ব্যবহার করুন। 
  • অন-পেইজ এসইওঃ অন-পেইজ এসইও দ্বারা আপনার ওয়েবসাইটের বিভিন্ন ওয়েবপেইজগুলোকে সার্চ রেজাল্টে ভালো র‍্যাংক করানোর কাজ করা হয়ে থাকে। যার মধ্যে রয়েছেঃ কন্টেন্ট অপটিমাইজ করা, ইউআরএল ঠিক করা, ইন্টারনাল লিংকিং করা, টাইটেল ঠিকঠাক রাখা সহ অন্যান্য নানা চর্চা। 
  • কন্টেন্ট মার্কেটিংঃ কন্টেন্ট মার্কেটিং হলো একটি গোছালো মার্কেটিং পলিসি যার মাধ্যমে সময়োপযোগী এবং ব্যবহারকারীরা খুঁজছে এমন কন্টেন্ট তৈরি করে তা বিভিন্ন মাধ্যমে আপলোড করা হয়। 
  • লিংক বিল্ডিংঃ আপনার ওয়েবসাইট যাতে এসইআরপি (সার্চ ইঞ্জিন রেজাল্ট পেইজেস) তে ভালো র‍্যাংক করতে পারে এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে হাইপারলিংক বা ব্যাক লিংকিং করার এই প্রচেষ্টাকেই লিংক বিল্ডিং বলা হয়ে থাকে।

৪. আপনার শেখাকে কাজে লাগান

ধরুন আপনি শারীরিক কসরত করার মাধ্যমে নিজেকে ফিট রাখতে চাইছেন, ঠিক সে সময়ে জিমে না গিয়ে শুধুমাত্র অনলাইনে এক্সারসাইজের ভিডিও দেখে তা যেমন সম্ভব নয়, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা প্রযোজ্য। 

শুধু অনলাইনে বিভিন্ন কন্টেন্ট দেখেই আপনার কার্যসিদ্ধি সম্ভব নয়, বরং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে নিয়মিত চর্চা করে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ঠিক এজন্যেই আপনার নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকা প্রয়োজন। সঠিক উপায়ে এসইও করার জন্য আপনার তিনটি জিনিস প্রয়োজন- সঠিক কীওয়ার্ডের ব্যবহার, নিয়মিত কন্টেন্ট তৈরি ও প্রচার, এবং লিংক বিল্ড করা। এসইও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, আর তাই নিরন্তর চেষ্টা করে যেতে থাকলে একসময় ভালো রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। 

৫. ফ্রি ডিজিটাল মার্কেটিং টুলগুলোর ব্যবহার সম্পর্কে জানুন

ইন্টারনেট মার্কেটিং বা ডিজিটাল মার্কেটিং জগতে পা রাখার সাথে সাথেই বিভিন্ন প্রিমিয়াম টুলগুলো ব্যবহার করা আপনার পক্ষে কিছুটা ব্যয়বহুল হতে পারে, তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই। বেশ কিছু ফ্রি টুলসের মাধ্যমেই আপনার সাধারণ কাজগুলো হয়ে যেতে পারে, যার মধ্যে রয়েছেঃ 

  • গুগল অ্যানালাইটিকসঃ গুগলের এই ফ্রি টুলটির মাধ্যমে আপনার ওয়েবসাইটে নিয়মিত ভিজিটরের সংখ্যা, কোন কোন পেইজ বেশি ভিজিটর আনছে, ভিজিটর কতক্ষণ অবস্থান করছে, ইত্যাদি তথ্য জানা যেতে পারে।
  • গুগল সার্চ কনসোলঃ এটিও গুগলের একটি ফ্রি টুল। সার্চ কনসোলের মাধ্যমে আপনি আপনার কোন কোন পেইজ, কী কী কীওয়ার্ড এর জন্য র‍্যাংক করেছে তা জানা যাবে। 
  • গুগল অ্যাডসঃ গুগল অ্যাডস এর মাধ্যমে আপনি বিভিন্ন ক্যাম্পেইন সাজাতে এবং অ্যাড চালাতে পারবেন। 
  • কনভার্টার কিটঃ এটি একটি প্রিমিয়াম ইমেইল মার্কেটিং টুল, তবে কনভার্টার কিট ব্যবহার করে আপনি ফ্রি ১০০০ সাবসক্রাইবারকে সেবা দিতে সক্ষম হবেন। 
  • বাফারঃ বাফার মূলত একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ম্যানেজিং টুল, যা ব্যবহার করে আপনি আপনার কন্টেন্ট পোস্টিং স্বয়ংক্রিয় করার সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। 

পরিশেষ

ডিজিটাল মার্কেটিং ক্রমাগত সময়ের এবং গ্রাহকদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই এই পেশায় ভালো করতে হলে নিয়মিত শেখা এবং সেই শেখাকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে ফলাফল অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। তাই নিয়মিত অনলাইন কোর্স করুন, ভিডিও দেখুন, পডকাস্ট শুনুন, আর্টিকেল পড়ুন, সর্বোপরি ট্রেন্ডের সাথে নিজেকে আপডেট রাখুন। 

পাশাপাশি আপনার নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগ বাড়িয়ে তুলতে হবে। এটি শুধুমাত্র ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আপনার ক্যারিয়ার প্রসারিত করতেই সাহায্য করবে না, বরং এমন অনেকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে যারা আপনার চেয়ে ভিন্ন এবং নতুন আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে উৎসাহী। কারণ সর্বোপরি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের এই বিশাল পরিসরে অন্যদের সাহায্য নিয়েই আপনাকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। 

হ্যাপি মার্কেটিং!

Facebook Comments
সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

আরও দেখুন

অনুরূপ লেখা গুলো

Back to top button
Close
Close