কোরবানির গরু কেনার সময় যে বিষয়গুলো জানতে হবে

কোরবানির গরু কিনুন
Share

সামনে ঈদ-উল-আজহা, দেশব্যাপী মুসলমানদের পবিত্র কোরবানির ঈদ। সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের অন্যতম প্রিয় ধর্মীয় উৎসব। এই বিশেষ দিনে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে বিভিন্ন ধরণের গবাদিপশু কোরবানি দেয়া হয়ে থাকে। প্রতিবছর এদেশে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখ গবাদিপশু কোরবানি করা হয়। কোরবানি উপলক্ষে আমাদের দেশের খামারি ভাইয়েরা বিভিন্নভাবে তাদের গবাদিপশুগুলো মোটাতাজাকরণ করেন, এরই মধ্যে কিছু অসাধু খামারি অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করার জন্য এই সকল গবাদিপশু বিশেষ করে গরুতে বিভিন্ন রকম গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড এবং অন্যান্য ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে মোটাতাজাকরণ করে থাকেন।

স্টেরয়েড হরমোন প্রয়োগ করা গরুর মাংস খেলে মানুষের কিডনি-লিভারসহ অন্যান্য সংবেদনশীল অঙ্গ নষ্ট হয়ে ডায়াবেটিস, ক্যান্সারসহ দ্রুত বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত পশুর মাংস গ্রহণ করার ফলে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিবর্তন দেখা দেয় নারী ও শিশুর শরীরে। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে স্থুলতা এবং পরবর্তীতে রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরলসহ নানা রকম রোগ বিস্তার লাভ করে।

মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিরূপ প্রতিক্রিয়া জন্য বিভিন্ন উন্নত দেশের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ পশু মোটাতাজাকরণের জন্য এইসব স্টেরয়েড নিষিদ্ধ করেছে। এইসব পণ্য সাধারণত গুরুতর রোগীদের জীবন রক্ষা করার জন্য ব্যবহার করা হয়, অথচ এখন এই পণ্যগুলোই গরু, ছাগল এবং অন্যান্য কোরবানির পশুর মধ্যে ইনজেকশন করা হচ্ছে বা খাওয়ানো হচ্ছে। এইধরণের হরমোন প্রাণীতে ব্যবহার না করার জন্য প্রাণী ফিড অ্যাক্ট-২০১০ অনুযায়ী দেশে Decason, Oradexon, Prednisolon, Betnenal, Cortan, Steron এবং আদম-৩৩ ইত্যাদি স্টেরয়েড হরমোন ভেটেরিনারি মেডিসিন নামে বিক্রি করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এই সব ঔষধ খাওয়ানোর ফলে গবাদিপশুর কিডনি ও লিভারের কার্যকলাপ ব্যাহত হয়, ফলে পশুর শরীর থেকে পানি বের হতে না পেরে শরীরে পানি জমা শুরু করে। ফলস্বরূপ গরু মোটা দেখায়। এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃতপক্ষে গরুর শরীরে কোন মাংস বৃদ্ধি হয় না। এছাড়াও গরু দ্রুত মোটাতাজাকরণ পদ্ধতিতে ওষুধ দেয়ার ২০-২৫ দিনের মধ্যে স্বাভাবিক ক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবার কারণে পশুর মৃত্যুও হতে পারে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরুকে ইউরিয়া, গুড় এবং খড় (UMS) নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে প্রায় ছয় মাস ধরে দৈনিক খাওয়ানো হলে গরুর শরীরে মাংস বৃদ্ধি হয়ে গরু স্বাস্থ্যবান ও হৃষ্টপুষ্ট হয়।

সত্যি বলতে মানুষ জেনে অথবা না জেনে কোরবানির ঈদের সময় অবৈজ্ঞানিক উপায়ে মোটাতাজাকৃত গরু কোরবানি দিয়ে এবং মাংস খেয়ে থাকেন। অতিরিক্ত হরমোন দেয়া গরুর মাংস আগুনেও হরমোনমুক্ত হয় না। এমন গরুর মাংস খাওয়া খুবই বিপজ্জনক। ফলে বিভিন্ন রোগব্যাধীতে আক্রান্ত হয়ে বিপুল পরিমান অর্থ চিকিৎসার জন্য ব্যয় করতে বাধ্য হন। কোরবানির গরু কেনা নিয়ে অনেকে তাই ভয়েও থাকেন। তবে যদি আপনি ট্যাবলেট বা হরমোন পুশ করা গরু চেনার উপায় আগেভাগেই জেনে নেন তাহলে ভয়ের আর কোনো কারণ থাকে না।

কিভাবে ভালো গরু বাছাই করবেন

গরু কেনার টিপস

  • কোরবানির গরু কিনতে যাওয়ার সময় অভিজ্ঞ কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচিত, যিনি ভালো ও সুস্থ গরু সঠিক চিনতে পারেন।
  • কোরবানির পশুর ক্ষেত্রে বয়স বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। গরুর ক্ষেত্রে বয়স কমপক্ষে দুই বছর হওয়া দরকার। সাধারণত এটা গরুটির দাঁত দেখে বুঝা যায়। সুস্থ পূর্ণবয়স্ক গরুর দাঁত দেখে ৫ বছর পর্যন্ত বয়স সনাক্ত করা যায় নিখুঁতভাবে। ২ বছর বয়সী একটি সুস্থ গরুর দু’টি স্থায়ী কর্তন দাঁত থাকে, ৩ বছর বয়সে চারটি, ৪ বছর বয়সে ছয়টি ও ৫ বছর বয়সে পুরো মুখে সর্বমোট আটটি স্থায়ী কর্তন দাঁত থাকে। দাঁতগুলো অক্ষত এবং দেখতে সুন্দর হয়।
  • ছাগলের ক্ষেত্রে বয়স কমপক্ষে এক বছর হওয়া উচিত। উটের ক্ষেত্রে কমপক্ষে পাঁচ বছর ভেড়ার ক্ষেত্রে কমপক্ষে এক বছর বয়স হতে হবে, তবে ছয় মাস বয়সী ভেড়া যদি বড়সড় হয় অর্থাৎ যদি দেখতে এক বছর বয়সের মত দেখায় তাহলে সেই ভেড়া কোরবানি করা যাবে।
  • দিনের আলো থাকতেই পশু কেনা ভালো। কেননা রাতের বেলায় পশু রোগাক্রান্ত নাকি সুস্থ তা ভালোভাবে বোঝা যায় না এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অসুস্থ গরু কেনার সম্ভাবনা থাকে।
  • পশুর মুখের সামনে কিছু খাবার ধরে দেখুন। সুস্থ পশু হলে নিজ থেকে জিভ দিয়ে খাবার টেনে নিয়ে খেতে থাকবে। অসুস্থ পশু সচরাচর খাবার খেতে চায় না।
  • পশুর নাকের দিকে লক্ষ করুন। সুস্থ পশুর নাকের উপরটা ভেজা ভেজা থাকে।
  • গর্ভবতী গরু কোরবানি দেওয়া হারাম। তাই সবার আগে সেটা নিশ্চিত হয়ে নিন।
  • সুস্থ পশুর পিঠের কুঁজ মোটা ও টান টান হয়।
  • গরু কেনার ক্ষেত্রে দেশি গরু কেনা ভালো। কেননা সীমান্ত পার হয়ে আসা বাইরের গরুগুলো ভ্রমনের কারনে বেশ ক্লান্ত থাকে, অনেক সময় ছোট-খাট আঘাতপ্রাপ্তও হয়। আর এধরণের ঝিমাতে থাকা গরু সুস্থ নাকি অসুস্থ সেটা বোঝা বেশ কঠিন।
  • সাধারনত বড় সাইজের গরুগুলোকে ইনজেকশন বা হরমোন ট্যাবলেট খাওয়ানো হয় বেশি। তাই কোরবানি করার জন্য বড় গরু না কিনে মিডিয়াম সাইজের গরু কেনা নিরাপদ।
  • মোটা গরু মানেই সুস্থ বা ভালো গরু নয়। মোটা গরুতে চর্বি অনেক বেশি থাকে, যা খেলে পর মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। আর অস্বাভাবিক মোটা গরু বিভিন্ন ঔষধ পুশ করে মোটাতাজাকৃত হতে পারে। তাই এধরণের গরু বর্জন করুন।
  • শরীরে অতিরিক্ত পানি জমার কারণে হরমোন দেয়া গরু বেশি মোটা দেখায়। এদের গায়ে আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে সেখানে দেবে গর্ত হয়ে থাকে অথবা সাথে সাথে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না।
  • পশু কেনার আগে এর শরীরের কোথাও ক্ষত আছে কিনা পরীক্ষা করে নিন। শিং ভাঙ্গা আছে কিনা, লেজ, মুখ, দাঁত, খুর এসব কিছুই পরীক্ষা করে দেখুন, কোন খুঁত চোখে পড়ে কিনা।

এসব বিষয় খেয়াল করে কোরবানির পশু কিনলে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ থেকে বাঁচা সম্ভব।

আরও কিছু টিপস নিন পশু বিশেষজ্ঞের কাছ থেকেঃ

গরু কিনতে যাওয়ার সময় সতর্কতা

গরুর হাট

  • কোরবানির পশু হাট থেকে বাড়িতে আনার জন্য একজন শক্ত-সামর্থ্য লোক সঙ্গে নিন।
  • হাটে প্রবেশের সময় ও হাটে থাকাকালীন সময়ে টাকাপয়সা ও মোবাইল সাবধানে রাখুন।
  • পশু কিনতে যাওয়ার সময় ভালো পোশাক না পরাই উত্তম। তাতে দাগ বা ময়লা লাগা খুবই স্বাভাবিক।
  • খাজনার হাত থেকে বাঁচার জন্য ভুলেও হাটের বাইরে থেকে পশু কিনবেন না। এতে লাভবান হওয়ার বদলে চোরাই পশু কেনার সম্ভাবনা থাকে বেশি।
  • হাটের খাজনা ঠিকমতো পরিশোধ করুন।
  • পশু কিনেই হাট থেকে পশুর খড় ও খাবার কিনে ফেলুন। এতে বাড়িতে আনার পর আর ঝামেলা পোহাতে হবে না। পশুর সঠিক যত্ন ও পুষ্টি খুবই প্রয়োজনীয়।
  • হাট থেকে পশু আনার সময় দড়ি দিয়ে পশুকে ভালোভাবে বেঁধে আনুন। পশুর সাথে সহমর্মিতার আচরণ করুন, অযথা অত্যাচার করবেন না।
  • কোরবানির আগেই কসাই ঠিক করে রাখুন। শেষ মুহূর্তে ঠিক করতে গেলে কসাই পাওয়া যায় না।
  • মাংস কেটে রাখার জন্য পরিষ্কার চাটাই সংগ্রহ করে রাখুন।

এসব ব্যাপার খেয়াল রাখলে ইনশাআল্লাহ কোরবানির গরু কিনতে গিয়ে আপনাকে আর বিভ্রান্ত হতে হবে না। এছাড়াও কোরবানির পশু বাসায় বসেও কেনা সম্ভব। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন মার্কেটপ্লেস bikroy.com/deals এ পাওয়া যাচ্ছে বিশ্বস্ত পশু ব্যবসায়ী দ্বারা বৈজ্ঞানিক এবং ঘরোয়া পদ্ধতিতে পালিত সম্পূর্ণ হরমোনমুক্ত কোরবানির পশু। অতএব যে মাধ্যমেই কোরবানির পশু কিনেন না কেনো, বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করলে ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে আপনাদের ঈদের আনন্দ বেড়ে যাবে বহুগুণে! শপিং হোক আনন্দের!

ইসলামে কি অনলাইনে কোরবানির পশু কেনার অনুমতি আছে?

সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

Comments

comments