চাকরি

একটি আকর্ষণীয় কভার লেটার লেখার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে ৪ টি বিষয়

আজকের দিনে কভার লেটার লেখার গুরুত্ব নতুন করে বলবার প্রয়োজন নেই। চাকরিতে আবেদন করার সময় আপনার সিভি (Curriculum Vitae) যতখানি গুরুত্বপূর্ণ ঠিক সেটিকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য একটি মানানসই কভার লেটারও প্রয়োজন। মূলত আপনার সিভিতে আপনার পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা জীবন, অন্যান্য কাজ সম্পর্কিত যোগ্যতার থাকে কিন্তু আপনি ওই নির্দিষ্ট পদের জন্য কেন যোগ্য তার উল্লেখ থাকে না। এই কারণেই একটি আদর্শ কভার লেটার লেখার প্রয়োজনীয়তা অনেকখানি। 

অন্যান্য দেশের মতো করোনা পরিস্থিতি আমাদের দেশেও একটি অস্থির অবস্থার সূচনা করেছে। যার কারণে অনেকখানি প্রভাবিত  বাংলাদেশে চাকরি পরিস্থিতি। আপদকালীন এই সময়ে দেশের বিভিন্ন খাতে কাজের সুযোগের অনিশ্চয়তা থাকবে। তবে এই অনিশ্চিত সময়ের সঠিক ব্যবহার করলে আপনি আপনার ভবিষ্যত চাকরি নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন।

আজ আমরা যে সমস্ত বিষয়ে আমরা আলোচনা করব, তার মধ্যে থাকছে – কভার লেটার কি এবং কভার লেটার কেন প্রয়োজন? কিংবা কভার লেটার লেখার সময় যে সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে। একই সাথে আপনি জেনে নিতে পারবেন কিভাবে সাজাবেন আপনার কভার লেটার। 

কভার লেটার কি ? কভার লেটার কেন প্রয়োজন ?

কভার লেটার মূলত একটি এক পেজের ডকুমেন্ট যেটি আপনাকে চাকরির আবেদন করার সময়ে সংযুক্ত করতে হবে। সিভির পাশাপাশি কভার লেটারের মাধ্যমে আপনি কি কারণে আপনার আবেদনকৃত পদের জন্য যোগ্য তার মূল্যায়ন করা হয়। কভার লেটার লেখার সুবিধা সমূহঃ

  • একটি গোছালো কভার লেটার আপনাকে অন্যান্য আবেদনকারীদের থেকে ইন্টারভিউ কল পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রাখবে। 
  • আপনার পদের জন্য আপনি ঠিক কতখানি যোগ্য তা প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত হয় কভার লেটারের মাধ্যমে অর্থাৎ এর মাধ্যমে আপনি নিয়োগকারী কর্মকর্তার চোখে আপনার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব স্থাপন করতে সক্ষম হবেন।   
  • সিভিতে যেখানে আপনার অভিজ্ঞতা এবং কর্ম-দক্ষতার কথা উল্লেখ থাকে ঠিক তেমনি কভার লেটার এর মাধ্যমে নিয়োগইচ্ছুক প্রতিষ্ঠানের কাছে আপনার আগ্রহের কথা প্রকাশ করার সুযোগ পাবেন। 

আজকের দিনে যেখানে একটি চাকরির বিপরীতে প্রচুর পরিমাণ আবেদন জমা হয়, সেখানে দাঁড়িয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমস্ত সিভি খুঁটিয়ে পড়ার সম্ভব হয়ে উঠে না। নিয়োগদাতা এক্ষেত্রে কভার লেটারে সংক্ষিপ্ত আকারে চোখ বুলিয়ে নিয়ে আপনাকে ডাকতে পারেন পরবর্তী ইন্টারভিউ এর জন্যে। তাই সিভি পাঠানোর পাশাপাশি একটি উপযুক্ত কভার লেটার লিখতে যেন ভুলবেন না।  

আপনার কভার লেটারে কি কি থাকতে হবে? 

কভার লেটার মূলত আপনার নিয়োগকর্তার কাছে আপনার উদ্দেশ্য এবং অভিজ্ঞতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। কভার লেটার আপনার সিভির সম্পূরক, তাই এখানে নিজের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করুন। যেহেতু আপনার সিভিতে আপনার কর্ম পরিবেশ, শিক্ষা জীবনের ব্যাপারে তথ্য রয়েছে তাই কভার লেটারে এই সকল তথ্যের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে ইন্টারনেট অথবা পত্রিকায় খোঁজ নিন, তাদের কর্মপরিবেশ সম্পর্কে জেনে নিয়ে আবেদন করুন।  

আপনার আবেদনকৃত পদের সাথে আপনার অভিজ্ঞতা, এবং স্কিল অনুযায়ী আপনি কতখানি উপযুক্ত তা সাবলীল ভাবে উপস্থাপন করুন। কভার লেটার লেখার সময়ে আরো যা যা উপস্থাপন করতে হবেঃ

  • আপনি যে পদের জন্য আবেদন করেছেন তার নাম প্রথম অনুচ্ছেদে উল্লেখ করুন। 
  • নিয়োগকর্তার নাম উল্লেখ করে সম্বোধন করতে হবে।
  • আপনি কেন উল্লেখিত পদের জন্য উপযুক্ত, সেটা সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরতে হবে। 

আমাদের দেশে চাকরি প্রার্থীদের অনেকেই সিভি লেখার নিয়ম কানুন সম্পর্কে সচেতন থাকলেও কভার লেটার লেখার ব্যাপারে সেভাবে কিছু জানেন না। বিশেষ করে যারা সবেমাত্র পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরি খুঁজছেন। 

লক্ষ রাখতে হবে খুঁটিনাটি বিষয়ে

যেহেতু আপনার কভার লেটার আপনাকে প্রাথমিক ভাবে উপস্থাপন করবে তাই সেটি হওয়া চাই আনুষ্ঠানিক ও আকর্ষনীয়। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভিউ দেওয়ার মতই সমান গুরুত্ব দিন কভার লেটার লেখার ক্ষেত্রে। লেখার সময় টুকিটাকি যেসব ব্যাপারে মনোযোগ দিতে হবেঃ

  • ব্যাকরণগত কোন ভুল ত্রুটি করা যাবে না। এতে করে আপনার ব্যাপারে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হতে পারে নিয়োগকর্তার।  
  • নিজের ব্যাপারে যে কোন কিছু বলার সময় সাহস এবং জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করুন। 

এছাড়াও চাকরিতে আবেদন করার পূর্বে প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ জেনে নিতে পারেন আপনার প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ভাষা বা টোন আলাদা। আপনাকে লিংকডইন, ফেসবুক, উইকিপিডিয়া, ওয়েবসাইট ঘেটে প্রতিষ্ঠানের রীতি, ভাষা, মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। আপনার পদের অবস্থান বুঝে কভার লেটার লিখতে পারলে তা আপনার জন্য সুবিধাজনক হবে। 

কিভাবে সাজাবেন আপনার কভার লেটার 

করোনা ভাইরাসের ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে যেভাবে আমাদের দেশের ব্যবসায়িক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, সেই অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্যে বেশিরিভাগ প্রতিষ্ঠানই চাইবে দক্ষ এবং যোগ্য কর্মী। তাই কর্মী বাছাই এর সময় একেবারে শুরুতেই নিয়োগকর্তার চোখে পরার জন্য আপনার সাজানো কভার লেটারই আপনার সহায়ক। 

ধরুন আপনার যা যা প্রয়োজন তার সমস্ত কিছুই লিখেছেন কভার লেটারে কিন্তু আপনার কভার লেটারটি সাজানো নয়। এক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা আপনার প্রতি আকৃষ্ট নাও হতে পারেন। শুরু থেকে শেষ অব্দি কিভাবে লিখবেনঃ 

সম্বোধন এবং শুরুর উপর গুরুত্ব দিন 

কভার লেটার লেখার শুরুতেই নিজের নাম এবং ঠিকানা উল্লেখ করে দিন। নাম ব্যবহারের সময় সার্টিফিকেটের নাম ব্যবহার করুন এবং ঠিকানা দেওয়ার সময় সাথে মোবাইল নাম্বার এবং ইমেইল অ্যাড্রেস উল্লেখ করে দিতে ভুলবেন না। যদি আপনার লিংকডইন প্রোফাইল থাকে তাহলে প্রোফাইল অ্যাড্রেস দিতে পারেন। 

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যাকে বরাবর আবেদন করতে বলা হয়েছে, তার নাম এবং পদবী সঠিকভাবে লিখুন। শুরুর অনুচ্ছেদটি গতানুগতিক ধারায় না লিখে ব্যতিক্রমী ভাবে লেখার চেষ্টা করুন। এতে করে নিয়োগকর্তার মনোযোগ আকৃষ্ট করে আপনার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রয়াস সফল হবে। 

আপনি কেন সেই পদের জন্য উপযুক্ত তা ফুটিয়ে তুলুন 

পরবর্তী অনুচ্ছেদে আপনার পূর্বের অর্জনের কথা উল্লেখ করুন যা আপনার নিয়োগের সাথে সম্পর্কিত। আবেদনকৃত অন্যান্য প্রার্থীদের তুলনায় কেন আপনি আলাদা সেটি তুলে ধরার চেষ্টা করুন। আপনার নিয়োগকর্তাকে শুরুতেই বুঝিয়ে দিন যে, তারা যেসব দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, গুণাবলী চাচ্ছে- তার প্রায় সবই আপনার মাঝে উপস্থিত। প্রয়োজনে আপনার দক্ষতাগুলো পয়েন্ট আকারে তুলে ধরুন।  

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই চায় তাদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ও দক্ষ কর্মীটিকে বেছে নিতে। পূর্ববর্তী কর্মক্ষেত্র থেকে আপনার শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ তুলে ধরতে পারেন, এতে করে নিয়োগকর্তা আপনার কভার লেটারটিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে। 

ইন্টারভিউ এর আবেদন 

এই অনুচ্ছেদে আপনি সেই কর্মস্থলে যোগদান করতে কতখানি ইচ্ছুক এবং আপনার যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের ইন্টারভিউ কল করার জন্য আবেদন করবেন। কভার লেটার থেকে শুরু করে ইন্টারভিউ অব্দি আপনাকে আপনার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করে যেতে হবে। অর্থাৎ এই সময়ে আপনার কার্যক্রমই বদলে দেবে আপনার সম্পর্কে নিয়োগকর্তার দৃষ্টিভঙ্গি। 

 পরিপূর্ণ সমাপ্তি টানুন 

শেষ অনুচ্ছেদে নিয়োগকর্তাকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে আপনার কভার লেটারের ইতি টানুন। পরিসমাপ্তি ব্যবহার করা যেতে পারে যা যা  লিখেঃ

  • Sincerely
  • Best Regards
  • Thank you

এই অংশের পরে আপনার নাম এবং স্বাক্ষর দিন। কভার লেটার লেখা শেষ হয়ে গেলেই পাঠিয়ে না দিয়ে বরং কয়েকবার যাচাই করে নিন। বানান ভুল থাকলে তা সংশোধন করে নিতে হবে। সর্বোপরি একটি নির্ভুল এবং যথাযথ কভার লেটার আপনাকে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে। ইন্টারভিউতে ভাল প্রস্তুতি নিতে চাইলে  শুরু থেকেই দেখে নিতে পারেন কিছু প্রয়োজনীয় ইন্টারভিউ টিপস।     

শেষকথা 

কভার লেটার লিখতে গিয়ে যেন খুব বড় না হয়ে যায় সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। পারতপক্ষে কঠিন শব্দ পরিহার করুন। কঠিন শব্দের ব্যবহার কখনোই নিয়োগকর্তার কাছে আপনার আবেদনের গ্রহনযোগ্যতাকে বাড়াবে না। আবার দেখে নিতে গিয়ে কখনো অন্যের কভার লেটার অনুকরণ করবেন না, এতে করে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আপনি চাইলে গুগল থেকে কিছু টেমপ্লেট নামিয়ে ধারণা নিতে পারেন, কিন্তু সরাসরি কপি করে বসিয়ে দেয়া যাবে না। 

উপরের সমস্ত গাইড লাইনগুলোকে যদি সংক্ষিপ্ত করা হয়ঃ 

  • আপনার নাম এবং ঠিকানা উপরে ডান পাশে লিখুন। 
  • নিয়োগকর্তার নাম সহ সম্বোধন করুন। 
  • আপনার দক্ষতা গুলো ফুটিয়ে তলুন। 
  • দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে নিয়োগকর্তার চাহিদা এবং আপনার দক্ষতার সামঞ্জস্য মেলে ধরুন । 
  • আপনার সাইন দিয়ে শেষ করুন। 
  • কভার লেটার ছোট এবং প্রাঞ্জল রাখার চেষ্টা করুন। 

ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করে নিজের উদ্দীপনা এবং ইচ্ছের বহিঃপ্রকাশ করুন। এমন ভাবে লিখার চেষ্টা করুন যাতে মনে হয় আপনি এবং নিয়োগকর্তা সামনা সামনি বসে কথা বলছেন। একটি সফল ক্যারিয়ার তৈরির ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার টিপসের পাশাপাশি শুরু থেকেই সিভি এবং কভার লেটার লেখার পারদর্শিতা আপনার জব মার্কেটে প্রবেশের পথে সহায়ক হবে। সুতরাং কভার লেটার লেখার খুঁটিনাটি বিষয়ে লক্ষ রাখুন। 

 

আপনার জন্য শুভকামনা! 

Facebook Comments
সাবস্ক্রাইব করুন

No spam guarantee.

আরও দেখুন

অনুরূপ লেখা গুলো

Back to top button
Close
Close