অর্থসাশ্রয়ের জন্য কীভাবে আপনার বাসার জিনিসপত্রের দক্ষ ব্যবহার করবেন?

আমাদের দেশে বিদ্যুতের ব্যবহার এর উৎপাদনের চাইতে অনেক বেশি হওয়ায় বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর কৌশল প্রয়োগের গুরুত্ব আগের চাইতে অনেক বেড়ে গেছে। বিভিন্নভাবে এ কাজটি করা যেতে পারে যেমন: জ্বালানীসাশ্রয়ী সরঞ্জাম ব্যবহার করা এবং সেগুলোকে সুকৌশলে ব্যবহার করা। এমনকি আপনার গৃহস্থালী সরঞ্জামাদি যদি পুরাতন হয়ে থাকে সেক্ষেত্রেও আপনি বিদ্যুৎ বাঁচানোর কৌশল শিখতে, আপনার বিদ্যুৎ বিল বাঁচাতে এবং চলমান বিদ্যুৎবিভ্রাটের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করতে পারেন।

খরচ বাঁচাতে সরঞ্জামাদি ব্যবহারের সেরা কৌশল

আপনার গৃহস্থালী সরঞ্জামাদি বিশেষ কৌশলে ব্যবহার করলে তা আপনার বিদ্যুৎ বিল প্রচুর পরিমাণে বাঁচাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আপনার ওয়াটার হিটারের থার্মোস্ট্যাটকে (thermostat) ৬০ বা ৫০ থেকে নামিয়ে দশ ডিগ্রী সেলসিয়াসে রাখলে তা আপনার সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের ১৮% সাশ্রয় করতে পারে। শীতকালে আপনার ওয়াটার হিটারটিকে যদি এমন স্থানে রাখা হয় যেখানে তা সরাসরি ঠান্ডা আবহাওয়ার সংস্পর্শে আসে তবে সেক্ষেত্রে সেটির পাইপটিতে তাপনিরোধী আবরণ লাগিয়ে (insulated) নিন। সেগুলোতে যদি তাপনিরোধী আবরণ না লাগানো থাকে তাহলে, বিশেষ করে শীতকালে, পানির তাপমাত্রা বজায় রাখতে আপানার ট্যাংকটির উপর অনেক বেশি চাপ পড়বে। সেগুলোকে ভালভাবে তাপনিরোধী আবরণ দিয়ে ঢেকে দিলে আপনি ট্যাংকের থার্মোস্ট্যাটটিকে আরও একটু নিচে নামিয়ে রাখতে পারবেন এবং ট্যাপ চালু করার পর গরম পানির জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষাও করতে হবে না।

রান্নাঘরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়

আপনার ফ্রিজের (refrigerator) ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয় যে, এখানে খরচ বাঁচানোর দুইটি কৌশল রয়েছে। প্রথমত, থার্মোস্ট্যাটকে সম্ভাব্য সবচেয়ে নিম্নস্তরে রাখতে হবে যাতে ফ্রিজ ঘনঘন চালু না হয়। আপনার ফ্রিজে যত কম খাবার রাখা থাকবে এটি ততটাই ঠাণ্ডা থাকবে এবং খাবার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না- এই সাধারণ নিয়মটি মনে রাখবেন।

দ্বিতীয়ত, আপনি যদি নতুন ফ্রিজ ক্রয় করেন তবে মনে রাখবেন যে, সেগুলোতে ডিফ্রস্ট (defrost) করার জন্য যে স্বংয়ক্রিয় ব্যবস্থা থাকে তাতে বিদ্যুৎ বেশি খরচ হয়। এর কারণ হলো সেগুলোতে অভ্যন্তরীণ কয়েল (internal coil) থাকে যেটি ফ্রিজের ভিতরে বরফ জমা ঠেকাতে নিয়মিত বিরতিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বাতাসের আর্দ্রতা ও আপনার রাখা খাদ্যদ্রব্য থেকে ফ্রস্টের উৎপত্তি হয় এবং এটিকে সরিয়ে ফেলা অতীব জরুরি; তবে তা করতে হয় কেবলমাত্র যখন দরকার ঠিক তখনই। ফ্রিজ কিনতে হলে হাতে হাতে ডিফ্রস্ট (manually defrost) করা যায় এমন ফ্রিজই কিনুন।

তৃতীয়ত, গরম খাবার ফ্রিজে রাখার আগে সেগুলোকে পুরোপুরি ঠাণ্ডা করে নিন। এতে করে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা হয় এমন অপ্রয়োজনীয় তাপ দূর করতে আপনার থার্মোস্ট্যাটের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে না।

মাইক্রোওয়েভ ওভেন ও টোস্টার ওভেনের তাপমাত্রা আদর্শ মানের (standard range) চাইতে সামান্য একটু বেশি মাত্রায় রাখলে তা আপনার বিদ্যুৎ খরচ কমিয়ে দেবে। মাইক্রোওয়েভ ওভেনগুলো সাধারণ ওভেনের তুলনায় মোটের ওপর এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। সেগুলো আপনার খাবারকে প্রথাগত (traditional) ওভেনের চাইতে অনেক বেশি দ্রুত গরম করে, ফলে এগুলোতে স্বভাবতই কম সময়ে কাজ হয়ে যায়। কাঁচা গোশত রান্না করা কিংবা কোনো কিছু ভাজার জন্য এটি খুব একটা সুবিধাজনক নয়। তবে, বেঁচে যাওয়া খাবার (leftovers) গরম করতে এটি অত্যন্ত কাজের।

রান্নাঘরে ছোট আকারের সরঞ্জাম এবং তৈজসপত্র ব্যবহার করলে তা আপনার গৃহস্থালী বিদ্যুৎ ব্যবহারকে আরও একটু বেশি সাশ্রয় করতে পারে। সাধারণত, আপনার সরঞ্জামটি যত ছোট আকারের হবে এটি চালাতে ততটাই কম বিদ্যুৎ খরচ হবে। আপনি ইতোমধ্যেই জেনেছেন যে, খাদ্যদ্রব্য পুনরায় গরম করার কাজে মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করলে তা আপনার অর্থসাশ্রয় করতে পারে। ছোট আকারের টোস্টার ওভেন এবং কম ওয়াটের (lower wattage) মাইক্রোওয়েভ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই কৌশলটি একইভাবে কাজ করবে।

আপনার বিদ্যুৎ বিল যেমনই হোক না কেনো, পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র (Water purifier) ক্রয়ে অর্থ ব্যয় করাটা আপনার জন্য একটি উত্তম বিনিয়োগ হতে পারে। এটি আপনার স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং সমস্ত বাসার পরিবেশকে ভালো রাখতে এটি একটি চমৎকার যন্ত্র। আপনি ঠিকই জানেন যে, আপনার অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি দরকার। সেজন্য আপনি যদি কোনো যন্ত্র কিনেও ফেলেন, তবে আপনি কি সত্যিই জানেন যে সেটি আদৌ পানিকে বিশুদ্ধ করছে না? কেউ কেউ পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করে থাকেন কিন্তু তাতে করে অতিমাত্রায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ খরচ হয়।

পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রগুলোকে পানীয় জলের স্থানীয় সমস্যাগুলো দূরীকরণার্থে নিদির্ষ্ট গঠনে তৈরি করা হয়ে থাকে ফলে সেগুলো নিশ্চিতভাবে কাজ করে। সেগুলো অবিশুদ্ধ পানির মধ্যকার সীসা এবং আর্সেনিকসহ রোগসৃষ্টিকারী অতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসকে দূর করে দিয়ে পানিকে বিশুদ্ধ করে। সারাদিন পানি গরম করার চাইতে বরং অল্প বিদ্যুৎ খরচের জন্য এটি একটি চমৎকার ব্যবস্থা। আপনার বাসস্থানের উপর নির্ভর করে, আপনি বিদ্যুৎ ব্যবহার করা ছাড়াই শুধুমাত্র ফিল্টার পরিবর্তনের মাধ্যমে চালানো যায় এমন ধরনের পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের খোঁজ করে দেখতে পারেন।

দক্ষ উপায়ে কাপড় ধৌত (Laundry) করুন

আপনার যদি ফ্রন্ট-লোডিং (front-loading) ওয়াশিং মেশিন থাকে তবে আপনি সৌভাগ্যবান। এগুলো সাধারণতঃ টপ-লোডিং (top-loading) মেশিনগুলোর তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ কম বিদ্যুৎ খরচ করে। আপনি যদি নতুন কোনো ওয়াশার কিনতে বাজারে যান তবে দেখেশুনে সঠিক আকারের যন্ত্রটি কিনুন, খুব বেশি বড় নয় আবার খুব বেশি ছোটও নয়। মনে রাখবেন, আপনার যন্ত্রটি যত বড় হবে বিদ্যুৎ খরচ ততই বেশি হবে এবং আপনার বিদ্যু বিলও বাড়বে।

এছাড়াও, গরম পানির পরিবর্তে ঠাণ্ডা পানির বিকল্পটি ব্যবহার করুন। বেশিরভাগ মানুষ মনে করে থাকেন যে, কাপড় পরিষ্কার করতে হলে বুঝি গরম পানি ব্যবহার করতেই হবে। অথচ কোনো কোনো কোম্পানীর ডিটারজেন্টের রাসায়নিক গঠনই এমন যে সেটি ঠাণ্ডা পানিতেই আপনার কাপড় সবচেয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে। আপনি গরম পানির পরিবর্তে ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করে সত্যিকার অর্থেই প্রচুর সাশ্রয় করতে পারবেন।

ওয়াশ সাইকেলের (wash cycle) শেষে আপনার ওয়াশারটিকে দ্রুত ঘুরিয়ে (fast spin) আপনি একেবারেই ড্রায়ার (dryer) ব্যাবহার না করে আপনার কাপড়কে প্রায় শুকিয়ে নিতে পারেন। এভাবে, গরমের দিনে প্রায় শুকনো কাপড়কে একটুখানির জন্য রোদে মেলে দিয়ে পুরোপুরি শুকিয়ে নিতে পারেন এবং আরও বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারেন।

বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া অতীব জরুরি

বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর সহকারি অধ্যাপক রাজিব কান্তি দাসের মতে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পিক আওয়ার (peak hours) হলো বিকেল ৫টা থেকে নিয়ে রাত ১১টা। এই চাপ কমাতে এবং দেশজুড়ে অতিরিক্ত ঘাটতি কমাতে সন্ধ্যার আগে বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ করা দরকার। রাজিব কান্তি দাস পিক আওয়ারে গৃহস্থালী পর্যায়ে এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন এবং কফি হিটার ব্যবহার এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। একটানা অথবা ঘনঘন ব্যবহৃত হয় না এমনসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার শেষে পুরোপুরি আনপ্লাগ করুন, এমনকি তা যদি সকালে বা দিনের বেলাতেও হয়।

এনার্জি স্টার চিহ্ন

আপনি যদি গৃহস্থালী সরঞ্জাম ব্যবহার করে থাকেন এবং অচিরেই যদি আরও ক্রয়ের পরিকল্পনা থাকে তবে খেয়াল করে সেইসব সরঞ্জামই ক্রয় করবেন যেগুলোতে এনার্জি স্টার চিহ্ন দেয়া আছে। এগুলো আপনার জন্য ৯০% পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হবে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য উপরের কৌশলগুলো প্রয়োগ করা হলে তাতে প্রত্যেকেই লাভবান হবেন।

Comments

comments