কিভাবে সুন্দর একটি জীবন বৃত্তান্ত (সিভি) লিখতে হয় – পর্ব ১

বর্তমান বিশ্বে চাকরির বাজার খুব বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ। চাকরির জন্য আবেদনকারীদের অধিকাংশই ইন্টারভিউ স্টেজ পর্যন্ত কখনই পৌঁছাতে পারে না।

নিয়োগকর্তারা নিয়মিতই একটি মাত্র পদের জন্য শতাধিক সিভির মধ্য থেকে স্কিমিং (মাখনের মতো ছেকে) করে প্রার্থী বাছাই করেন। এমন একটি জনাকীর্ণ ক্ষেত্রে, আপনার সিভি যদি না সত্যিই সবার চেয়ে ভালো হয় তাহলে ওই সিভির কথা ভুলে যাওয়া খুবই সহজ বিষয়।

এখানে আপনার সিভি জনপ্রিয় বা পছন্দনীয় করে তুলতে এবং অধরা চাকরির ইন্টারভিউ এর জন্য সিভি তৈরি করতে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস উপস্থাপন করছি।

 

download (1)

দৃষ্টিনন্দন ফরমেটিং (বিন্যাস) হওয়া উচিত:

গবেষণার তথ্য অনুযায়ি, চাকরিকর্তারা নিয়োগদানের সময় প্রত্যেকটি সিভি দেখার জন্য মাত্র ২০ সেকেন্ড সময় ব্যয় করে থাকেন, এবং তারা আবেদনকৃত প্রার্থীদের মধ্য থেকে দ্রুত সবচেয়ে ভালো প্রার্থী বেছে নিতেই মনোযোগ দেন। আর আপনি যদি এই প্রাথমিক স্ক্রিনিং পর্যায়েই আগাছামুক্ত (পরিচ্ছন্ন) না হন তাহলে ইতোমধ্যেই এই প্রাথমিক পর্যায় থেকেই আপনার চাকরি পাওয়ার আশা শেষ হয়ে গেছে। কারণ আপনি কখনই এই ইন্টারভিউয়ে ডাক পাবেন না।

তাই কিভাবে আপনার সিভি আবর্জনার পাত্রে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া থেকে রক্ষা করবেন বা এড়াবেন? ফরমেটিং

ফরমেটিং বলতে বোঝায়, সিভি লেখার ক্ষেত্রে পাতাটিকে সংগঠিত করা। যেমন, পাতাটির প্রস্থে মার্জিন দেয়া, হেডারের আকার, টাইপফেইস বা নির্দিষ্ট টাইপের ডিজাইন ইত্যাদি। তাই সবচেয়ে ভালো হয়, পরিচ্ছন্ন ফরমেটিং। কোন শব্দ পড়ার আগেই নিয়োগকর্তারা সবার আগে সিভির ফরমেটিং দেখে থাকেন। সিভি পরিচ্ছন্ন ফরমেটিংয়ে হলে অত্যন্ত ভালো হয় কেননা এতে নিয়োগকর্তাদের আকৃষ্ট করে। এটা পেশাদারিত্বের প্রমাণ বা স্পষ্ট করা এবং কোন বিষয়ে গভীর আগ্রহের বিস্তারিত তথ্য। পঙ্কিল বিন্যাস (স্লোপি ফরমেটিং) কারো সম্পর্কে অমনোযোগী এবং অলসতার পরিচয় তুলে ধরে।
অনেকেই মনে করেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার ভালো দক্ষতা আছে এবং অত্যন্ত ভালো মানের শিক্ষাগত যোগ্যতার পটভূমি আছে ততক্ষণ পর্যন্ত সিভি’র ফরমেটিং কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। আপনার এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ নিয়োগকর্তারা এমন একজনকে সিভিগুলো দেখার জন্য দায়িত্ব দিয়ে থাকেন যিনি আবেদনকারীদের আবেদনের স্তুপ থেকে দশ থেকে শতাধিক সিভি পড়ে থাকেন।
তাই সিভি’র ফরমেট ভালো হলে শতাধিক সিভি থেকে আপনার সিভিটি বেছে নেয়ার জন্য এটি সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং গতানুগতিক বা একঘেয়ে সিভি দেখার ক্ষেত্রে চোখকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। আর চাকরি খোঁজার এই কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্যে আপনাকে প্রথম ইম্প্রেসন হওয়ার সুযোগ করে দেয় বা এগিয়ে রাখে।

প্রধান ভুলগুলো পরিহার করা:

· সিভি খুব বেশি ঘিঞ্জি না করা : এমএস (মাইক্রোসফট) ওয়ার্ডের পূর্বনির্ধারিত সেটিংসয়ের পরিবর্তন করে মার্জিন খুব বেশি ছোটখাটো না করা। বিভিন্ন সেকশনের মধ্যে পর্যাপ্ত স্পেস বা জায়গা রাখা। যখন আপনার সিভিকে চোখের সামনে ধরা হয় তখন সৌন্দর্য্যরে কারণে এটি চোখেকে প্রশান্তি দেয় বা ব্রেথিং রুম হিসেবে কাজ করে।
· সিভি খুব বেশি শূণ্য বা খালি না রাখা: আপনার সিভি যদি খুব বেশি অংশ খালি থাকে বা অত্যধিক জায়গা সাদা থাকে তাহলে মনে করা হয় আপনার জন্য খুব বেশি অফার নেই।
· ধারাবহিকভাবে ফন্ট ব্যবহার করুন: আপনার জীবন বৃত্তান্তে ধারাবাহিকভাবে একই ফন্ট ব্যবহার করুন। লেখার ক্ষেত্রে ফন্টের টাইপ বা সাইজ খুব বেশি পরিবর্তন করবেন না। এটাকে বিরক্তিকর মনে করা হয়।
· পরিচ্ছন্ন এবং মানসম্মত ফন্ট ব্যবহার করুন: জীবন বৃত্তান্ত লেখার ক্ষেত্রে অজানা-অচেনা বা অদ্ভুত ফন্টের ব্যবহার যেমন ইমপ্যাক্ট অথবা ক্যুরিয়ার পরিহার করুন। এর পরিবর্তে অ্যারিয়াল, টাইমস নিউ রোমান, হেলভেশিয়া ফন্ট ব্যবহার করুন।

সিভি সংক্ষিপ্ত করুন! – একটি পেইজই যথেষ্ট

Thomas-Jefferson-One-Word-Will-Do

আমি একবার একজন সাবেক বস কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি যে সিভিগুলো পেয়েছেন এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সিভি কোনটি ছিল? তিনি আমার প্রশ্নের উত্তর খুব দ্রুত চমৎকারভাবে দিলেন: যখন কেউ কোন একটি কলেজ থেকে মাত্রই গ্রাজুয়েশন শেষ করে চার পেইজের সিভি দেয়, তখনই তারা চাকরির জন্য অযোগ্য বিবেচিত হন।

আপনি যদি কোন একটি বিশেষ ক্ষেত্রে বা সেক্টরে অনেক বেশি সিনিয়র এবং খুব বেশি অভিজ্ঞ না হন (অভিজ্ঞ হলে এই ব্লগটি আপনার পড়ার প্রয়োজন নেই) তাহলে আপনার সিভি এক পেইজেরই হওয়া উচিত।

সিভি লেখার ক্ষেত্রে একটি কমন ভুল সবচেয়ে বেশি করা হয়। মানুষ মনে করে একটি একক পেইজের সংক্ষিপ্ত ও পরিচ্ছন্ন সিভির চেয়ে কাজের অভিজ্ঞতা এবং শখের বর্ণনাসহ দীর্ঘ সিভি অনেক বেশি হৃদয়স্পর্শী। তবে এটি সম্পূর্ণরূপে একটি ভুল ধারণা।

সত্য হচ্ছে এই যে, এখন যদি আপনি আপনার ক্যারিয়ারের একদম সূচনালগ্নে থাকেন তাহলে প্রকৃতপক্ষেই আপনার সিভিতে প্রয়োজনীয় উপকরণসহ এক পেইজের বেশি হওয়া অসম্ভব। এটা কোন বিষয় না, বড় বিষয় হলো আপনি ওই কাজের জন্য কতটা দক্ষ, আপনার যে দক্ষতা, অর্জন তা আবেদনকৃত চাকরির ক্ষেত্রে কতটা ফিট এবং সরাসরিভাবে যুক্ত তা এক পেইজের মধ্যেই তুলে ধরতে হবে। আবার এক পেইজের কম যেনো না হয়।

আপনার জীবন বৃত্তান্তে অপ্রয়োজনীয় পাঠ্যক্রম বহিঃভূত কার্যক্রমের উল্লেখ (প্যাডিং) পরিহার করুন। আপনি যে পদ বা পজিশনের জন্য আবেদন করছেন সেই পদ বা পজিশন এবং দক্ষতা সম্পর্কিত তথ্যের উপর জোর দিন। আপনি এর আগে যতগুলো চাকরি করেছেন বা যতগুলো স্টুডেন্ট ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন তার প্রত্যেকটির পৃথকভাবে তালিকা দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। শুধু যে চাকরি বা যে ক্লাবের সাথে সংশ্লিষ্টতা ওই চাকরির সাথে সম্পর্কিত কেবল সেই চাকরি এবং ক্লাবের কথা উল্লেখ করুন।
সিভিতে নিজেকে বলিষ্ঠ আরও বেশি চিত্তাকর্ষক হিসেবে উপস্থাপন করার পরিবর্তে নিয়োগকারীদের প্রয়োজন এমন বিষয়ের উপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। এবং কখনই ভুলে যাবেন না- আপনি যে পদেন জন্য আবেদন করছেন সেই পদে নিয়োগকর্তাদের নিকট শতাধিক সিভি রয়েছে এবং তারা সেই শতাধিক সিভি থেকেই তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিবেন। আপনার সিভি যদি এক পেইজের বেশি হয় তাহলে তা আবর্জনার ঝুড়িতে নিক্ষেপ হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি!
উদাহরণ ব্যবহার করুন:
সিভি তৈরির সময় খারাপ ফরমেটিংয়ের ত্রুটি পরিহার করার জন্য খুব সহজ পথ রয়েছে। এজন্য সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য সিভিগুলোকে অনুসরণ এবং উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আর এগুলো খুব সহজেই অনলাইনে পাওয়া যায়। এসব জীবনবৃত্তান্ত অধিকাংশই ওয়ার্ড প্রসেসিং সফটওয়্যার প্রাক-অন্তনির্মিত মানদণ্ড রয়েছে।

নিচের ছবিতে একটি জীবনবৃত্তান্তের পরিচ্ছন্ন ফরমেট দেখানো হচ্ছে। মাত্র এক পেইজের মধ্যেই উচ্চ মানসম্পন্ন সিভি এটি। এটা আপনার সিভি তৈরির জন্য খুব ভাল মানদ- ও নিয়ামক হতে পারে। বিনা দ্বিধায় আপনি এটির সাথে আপনার পছন্দ অনুযায়ি সংযোজন বা বিয়োজন করতে পারবেন। গুড লাক!

classic-rome

 

Comments

comments