নবীন খামারিগণ কীভাবে হাঁসমুরগি লালন-পালন করবেন

এই সহজবোধ্য নিবন্ধটিতে বাংলাদেশে নবীন খামারিদের জন্য রোগমুক্তভাবে হাঁসমুরগি পালনের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এমন অনেক বিষয় আছে যেসব বিষয়ে সতর্ক না থাকলে হাঁসমুরগি আহত অথবা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়তে পারে। সেকারণে পাখিগুলোকে প্রতিদিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। অসুস্থ হাঁসমুরগির মাংস খেলে মাংসভক্ষণকারীও দু’চার দিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়বে। আপনি যদি বিক্রয়যোগ্য পাখির সন্ধান পেতে চান তবে নির্দিষ্ট পাখির দোকানে তা খুঁজে দেখতে পারেন। হাঁসমুরগিকে মোটাতাজা করতে চাইলে ও নিরাপদ রাখতে হলে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।

১। সদ্যজাত মুরগিছানা

মুরগির বাচ্চা যখন ডিম ফুটে প্রথম বের হয় তখন ২৪ ঘন্টার মধ্যে সেটাকে নিয়ে খেলা করা বা হাতের মধ্যে ধরে আদর করার চেষ্টা করবেন না। সদ্যজাত বাচ্চাগুলোকে যখন খাবার পানি দেবেন তখন খেয়াল করবেন যেন তা যথেষ্ট উষ্ণ থাকে। এর কারণ হলো, সদ্যজাত বাচ্চার আকৃতি ক্ষুদ্র হওয়ায় সে তার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় তাপ নিজে থেকে তৈরী করতে পারে না। এই বাচ্চাকে যদি খুব বেশি ঠান্ডা পানি খেতে দেয়া হয় তাহলে তার শরীরের তাপমাত্ত্রা খুব দ্রুত কমে যাবে। এতে করে বাচ্চাটি জ্ঞান হারাতে পারে এবং অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।

খাবার

আপনার খামারের মুরগিছানাগুলোকে স্টার্টার/গ্রোয়ার ফিড (starter/grower feed) দিয়ে খাবার খাওয়ানো শুরু করুন, আর এই খাবার তাদের জন্যই বিশেষভাবে তৈরী। এ খাবার খেয়েই তারা একসময় মুরগি বা মোরগে পরিণত হবে। প্রথম দিন কিছু খাবার একটি বিছিয়ে রাখা টিস্যুপেপারের উপর ছড়িয়ে দিন। এতে করে একেবারেই নতুন বাচ্চাগুলোর জন্য খাবার ঠোঁটে তুলতে সুবিধা হবে। একটি ঢাকনাহীন লম্বা সরু পাত্র বা trough ব্যবহার করুন এবং এর মধ্যে খাবার ঢেলে দিন। এই পাত্রটিকে মেঝের একেবারে কাছাকাছি স্থাপন করা খুবই জরুরী। এতে করে আপনার মুরগিছানাগুলো খাবারের জায়গাটি দেখতে পাবে এবং সমস্যা ছাড়াই তা খেতে পারবে। আপনার মুরগিছানার সংখ্যা যদি ২৫ বা তার কম হয় তাহলে আপনার খামারের জন্য এক ফুট লম্বা পাত্র দরকার হবে। আপনার মুরগিছানাগুলো তাদের প্রয়োজনীয় খাবারের অব্যহত সরবরাহ পাচ্ছে কি -না সবসময় তা খেয়াল রাখবেন। আপনি যদি তাদেরকে অভুক্ত রাখেন তবে তারা সহজেই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়বে। আপনার মুরগিছানাগুলো যতদিন না প্রথম ডিমপাড়া শুরু করে ততদিন পর্যন্ত তাদেরকে স্টার্টার/গ্রোয়ার ফিড (starter/grower feed) খাওয়ানো চালিয়ে যান।

তাপমাত্রা

মুরগিছানাগুলো যখন একেবারেই ছোট থাকে তখন শরীরের তাপমাত্রা যথেষ্ট উষ্ণ না হলে তারা সাধারণত নিজে থেকে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ শুরু করে না। তাই, মুরগিছানাগুলো ফুটে বের হওয়ার পর প্রথম পাঁচ ঘন্টার জন্য ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রার পরিবেশ সৃষ্টি করতে আপনাকে উপযুক্ত তাপের উৎসের ব্যবস্থা হবে। পাঁচ ঘন্টা পর আপনি তাপমাত্রা কমিয়ে ৯৭ ডিগ্রী ফারেনহাইট করতে পারেন এবং এ অবস্থায় রেখে পরবর্তী ৪৮ ঘন্টা পর্যবেক্ষণ করবেন। মুরগিছানাগুলোর জন্য তাপের উৎস হিসেবে আপনি ১৫০, ১০০ অথবা ৭৫ ওয়াটের বৈদ্যুতিক বাল্ব লাগাতে পারেন।

পানি

২৫ থেকে ৫০ টি বাচ্চার জন্য এক গ্যালন পানি দরকার। বাচ্চাগুলোকে খেতে দেয়ার আগে পানিকে ৯৭ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত গরম করে নিন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন খেতে দেয়ার আগে গরম পানিকে সামান্য ঠান্ডা করে নিবেন, তবে লক্ষ্য রাখবেন যেন তা অবশ্যই কিছুটা গরম থাকে। তৃতীয় দিনের পর থেকে কক্ষ তাপমাত্রার পানি খেতে দেয়া যেতে পারে। বাচ্চাগুলোর পিঠ আলতোভাবে ঠেলে তাদের ঠোঁট পানিতে চুবিয়ে দিয়ে পানির স্বাদ গ্রহণে সাহায্য করুন। আপনি এটা একবার করে দিলে তারপর থেকে তারা নিজেরাই পানি খেতে থাকবে। মুরগির বাচ্চাগুলোর জন্য সবসময় প্রচুর পরিমাণে পানির সরবরাহ বজায় রাখুন।

অন্যান্য প্রাণী

আপনার অন্যান্য পোষা প্রাণী বা খামারের অন্যান্য প্রাণী থেকে আপনার সদ্যজাত মুরগিছানাকে আলাদা রাখুন। বিড়াল কিন্তু সুযোগ পেলেই মুরগিছানাকে সাবড়ে দেবে। মুরগিছানাগুলোর চারপাশে বেড়ার ব্যবস্থা করুন এবং তাদেরকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা রাখুন।

২। কোয়েল এবং রঙিন পাখি

উপরে দেয়া নিদের্শনাগুলো যদিও হাঁসমুরগি পালনের জন্য দেয়া হয়েছে, তবুও কোয়েল এবং রঙিন পাখি পালনের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে। তবে কিছু বিষয়ে সামান্য রদবদল করতে হবে। তাদের জীবনের প্রথম সপ্তাহজুড়ে তাদেরকে ৯৮ থেকে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রাবিশিষ্ট কক্ষে রাখুন। দ্বিতীয় সপ্তাহজুড়ে কক্ষের তাপমাত্রা আগের চাইতে পাঁচ ডিগ্রী কম করে রাখতে পারেন। এভাবে আপনি ইচ্ছা করলে ৭০ ডিগ্রী ফারেনহাইটে না পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে পাঁচ ডিগ্রী করে তাপমাত্রা কমাতে পারেন। আপনাকে নিয়মিতভাবে তাপমাত্রা পরিমাপ করতে হবে। এ ব্যাপারটি তাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই সংবেদনশীল। আপনার ঘরে যদি থার্মোমিটার না থাকে তবে আপনার উচিত একটি থার্মোমিটার কিনে ফেলা। আপনি একটা পানির পাত্র কেনার কথাও ভাবতে পারেন যা হাঁসমুরগি পালনের জন্য বিশেষভাবে তৈরী। এগুলো এমনভাবে তৈরী যাতে বাচ্চাগুলো দূর্ঘটনাবশত এর মধ্যে পড়ে গিয়ে পানিতে ডুবে মরবে না। বাচ্চা রাখার মেঝেতে কখনোই তারের তৈরী মেঝে-আবরণী বিছিয়ে দেবেন না, কারণ এতে সহজেই বাচ্চাগুলোর পা আটকে যেতে পারে।

৩। টার্কি

মুরগিছানা পালনের নিয়ম ব্যবহার করে আপনি টার্কিও পালন করতে পারেন। এটা মনে রাখা দরকার যে, মুরগিছানার চাইতে সদ্যজাত টার্কি খুব সহজেই ঠান্ডায় কাতর হয়। আপনার টার্কিগুলোকে তাদের খাবারের জায়গা দেখিয়ে দিন যাতে করে সে তার খাবার ঠিক জায়গা খুঁজে পেতে পারে। আপনি যদি প্রথম দু’একবার দেখিয়ে না দেন তবে এগুলো তাদের খাবার খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়বে। আপনার টার্কিগুলো তাদের প্রয়োজনীয় পরিমাণে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করছে কি-না তা ভালভাবে লক্ষ্য রাখুন। এরা কিন্তু খাবার খুঁজে না পেলে ক্ষুধায় কাতর হয়ে কখন মরে পড়ে থাকবে আপনি টেরই পাবেন না। আপনার কয়েকটি মুরগিছানাকে টার্কিদের সাথে থাকতে দিন। টার্কিগুলো মুরগিছানাগুলোর কাছ থেকে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের অভ্যাসটি শিখবে।

৪। রাজহাঁস ও পাতিহাঁস

যদিও নবজাত রাজহাঁস আর পাতিহাঁস পালনের নিয়ম মুরগিছানা পালনের নিয়মের অনুরূপ তবুও মুরগিছানার মতো এদের জন্য অতটা উষ্ণতার প্রয়োজন হয় না। রাজহাঁস আর পাতিহাঁস পানি খাওয়ার সময় সাধারণত পরস্পর ঠেলাঠেলি আরম্ভ করে, তাই এটা সামাল দিতে আপনার পূর্বপ্রস্তুতি থাকতে হবে। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে আপনার রাজহাঁস আর পাতিহাঁসগুলো পানির যেই উৎস থেকে পান করে থাকে সেটা মেঝেতে দৃঢ়ভাবে আটকানো রয়েছে। এর ফলে তারা পানির পাত্রটিকে উল্টে ফেলতে পারবে না। আপনি যখন রাজহাঁস আর পাতিহাঁসগুলোকে খাবার খাওয়াবেন তখন খেয়াল রাখবেন যে, তাদের জন্য পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। রাজহাঁস আর পাতিহাঁসকে মুরগির বাচ্চার চাইতে বেশ কিছুদিন আগেই চরিয়ে বেড়াতে দেয়া যায়। শিশু রাজহাঁস ঘাস ও আগাছা খেতে পারে। আপনি তাদেরকে বাইরে চরিয়ে বেড়ানোর সুযোগ দেয়ামাত্র তারা এগুলো খাওয়া শুরু করবে।

একটি অতীব জরুরী বিষয়: আপনার শিশু রাজহাঁস বা শিশু পাতিহাঁসটিকে কক্ষণো পানিতে সাঁতার কাটতে দেবেন না। পানিতে নামার সময় সাঁতার শেখানোর জন্য তাদের মা যদি তাদের সঙ্গে না থাকে তবে তারা ডুবে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকবে। তাদের পাখার নিচে পানি ঢুকে গিয়ে তাদেরকে পানির নিচে ডুবিয়ে দেবে। তারা যদি দুই বা তিন মাস বয়সের হয় তবে আপনি তাদেরকে সাঁতার কাটার জন্য পানিতে ছেড়ে দিতে পারেন। পাতিহাঁস ও রাজহাঁসকে একত্রে পালন করা যায়। এদেরকে আপনার মুরগিছানা, শিশুটার্কি বা অন্যকোনো পাখির সাথে একই স্থানে রাখা ঠিক হবে না। পানি পান করার সময় পাতিহাঁস ও রাজহাঁস গাদাগাদি হয়ে ঠেলাঠেলি শুরু করে। একাজ করতে গিয়ে এরা আপনার অন্যান্য পাখিগুলোকে পানিতে চুবিয়ে দিতে পারে, ফলে সেগুলো অসুস্থ হয়ে মারা যেতে পারে।

Comments

comments