আমাদের দেশে ২০১৫ সালে রিয়েল এস্টেট খাতের ৬ টি প্রবণতা

বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় ধরনের রিয়েল এস্টেটের বাজার চড়া সুদের ঋণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান শহুরে জনসংখ্যার কারণে মর্মান্তিক রকমের নাজুক হয়ে পড়েছে। এ অবস্থার কারণে খুব কম সংখ্যক নির্মাণকাজ শুরু হতে দেখা গেছে এবং রিহ্যাবের হিসাবমতে ডেভলপারদের আগ্রহে শতকরা ৭৫ ভাগের মত নাটকীয় পরিমাণে ভাঁটা পড়েছে। ২০১৩ সাল জুড়ে পরিস্থিতি মন্দা থাকলেও ২০১৪ সালে এ খাতটিকে উজ্জীবিত করতে সম্ভ্যাব সরকারী সহায়তা প্রদানের খবরে কিছুটা আশাবাদ দেখা গিয়েছিলো, যদিও ব্যাংক এবং ঋণদাতা সংস্থাগুলো ডেভলপার থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত সকলকে বর্ধিত হারের ঋণ প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করেছিল। কিছু কিছু শিল্প বিশেষজ্ঞ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ২০১৫ সালে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার উন্নতি না হয়েই পারে না। নিচের ছয়টি প্রবণতার মাধ্যমে এই আশাবাদের প্রতিফলন ঘটেছে যা হয়ত শেষ পর্যন্ত দেশের রিয়েল এস্টেটের বাজারকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।

প্রবণতা# ১: রিয়েল এস্টেট ডেভলপমেন্ট, বিক্রয় এবং ব্যক্তিগত মালিকানায় রিয়েল এস্টেট রাখার ব্যাপারে তরুণদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। দেশে ঝুঁকি গ্রহণে ইচ্ছুক ও সৃজনশীল ভাবনার নতুন প্রজন্মের জন্ম হচ্ছে যারা নিজেদের, তাদের গ্রাহকদের এবং সমগ্র জাতির ভাগ্য বদলাতে করণীয় সবকিছু করতে আগ্রহী। বিশেষ করে, অনলাইনে বাজার যাচাইয়ের সামর্থ, সহজলভ্য উৎস থেকে মুনাফা করার মত উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সরকারী আইন কানুনের পরাকাষ্ঠা সৃজনশীল উপায়ে সামলিয়ে চলার দক্ষতা ইত্যাদি থেকেই তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের ব্যাপারটি বোঝা যায় যারা প্রযুক্তির সহায়তা নিতে এবং দেশীয় সম্পত্তি কেনাবেচা সংক্রান্ত কাজে উদ্ভাবনী উপায় অবলম্বনে কুণ্ঠিত হয় না।

প্রবণতা# ২: অধিক বিনিয়োগবান্ধব খাত। দেশের রিয়েল এস্টেট এবং হাউজিং ব্যবসা যেহেতু সত্যিকার অর্থেই আমাদের জিডিপিতে (শতকরা ১২ থেকে ১৫ ভাগ) অবদান রাখে তাই গত কয়েক বছর যাবত এই শিল্পখাতটি রাজনৈতিক অস্থিরতায় পতিত হওয়ায় তা পুষিয়ে নিতে বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের অর্থপ্রাপ্তির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে এবং দেশের জিডিপির উপর ইতিমধ্যেই সে প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। লামুডি (Lamudi) রিয়েল এস্টেট সংস্থা অনুমান করছে যে, ইউ.এস, মালয়েশিয়া, সউদী আরব ও সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীদের সাধারণ প্রবণতা অনুসারে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ যদি বর্তমান হারে বাড়তে থাকে তাহলে উপরিউল্লিখিত শতকরা ১৫ ভাগ বাংলাদেশী জিডিপির শতকরা ২৪ ভাগ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।

প্রবণতা# ৩: রিয়েল এস্টেট ক্রয়বিক্রয়ের খুঁটিনাটি সম্পর্কে জনগণ আরও বেশি জ্ঞানলাভ করছে এবং মতামত জানতে পারছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ২০১৫ সালে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান শতকরা ৭৩ ভাগ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে এবং ভোক্তাগণ তাদের অস্থাবর আয় উপার্জন ফ্ল্যাট, এপার্টমেন্ট এবং বাণিজ্যিক সম্পত্তিতে বিনিয়োগের কাজে ব্যবহার করছেন। আবাসনের চাহিদা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, কারণ এই শিক্ষিত শহুরে জনগোষ্ঠি তাদের সাধ্যের মধ্যে আরও বেশি শিক্ষা গ্রহণের সুবিধা পেতে চায় যাতে পরবর্তীতে ভালো চাকুরি এবং অধিক বেতন প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়। আবেগগতভাবে, দেশের বিত্তশালী এবং নব্য বিত্তশালী লোকজন নিজের একটি স্থায়ী আবাস পেতে চান যাতে তারা সেখানে অবস্থান করে তাদের পেশাজীবন এবং পরিবার পরিচালনা করতে পারেন। আর এই বিশাল সমস্যার সমাধান হতে পারে একখণ্ড রিয়েল এস্টেটের মালিকানা অর্জনের মাধ্যমে।

প্রবণতা# ৪: ইন্টারনেটের ক্রমপ্রসার — যদিও বাংলাদেশে গতি ও সুবিধার দিক থেকে এখনও তা খুব একটা উপযোগী নয় — ফ্ল্যাট, এপার্টমেন্ট এবং বাণিজ্যিক সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে লোকজনকে ভিন্নমাত্রার একটি সুবিধা এনে দিয়েছে কারণ, বিক্রয়যোগ্য সম্পত্তির খোঁজখবর ও যাচাইবাছাই করতে তাদেরকে এখন আর শক্তি ও সময় খরচ করে এদিক সেদিক দৌড়ঝাঁপ করতে হয় না। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের তথ্যমতে, ২০১৩ সালে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৩৩ মিলিয়ন যা মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ২২ ভাগ এবং এই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে চলেছে, বিশেষ করে, যখন নতুন নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে গতিও বাড়ছে। ২০১৪ সালে বাড়ী ক্রেতা মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭২ ভাগ বাড়ী খোঁজার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন এবং রিয়েল এস্টেট পেশাজীবীগণের ৮২ ভাগ গ্রাহককে পরিষেবা প্রদান থেকে শুরু করে সম্পত্তির বিজ্ঞাপন প্রদান পর্যন্ত সকল কাজ ইন্টারনেটের মাধ্যমে সম্পন্ন করেছেন। ২০১৬ সালে বিপুল পরিমাণে অনলাইন এবং মোবাইল মার্কেটিংয়ের রেকর্ডসৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রবণতা# ৫: মধ্যবিত্ত ভোক্তাশ্রেণি সম্পদশালী হয়ে উঠছে এবং এই প্রবণতা ২০১৫ সাল জুড়েই চলবে বলে আশা করা যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, সমাজ গবেষক এবং সরকারী প্রাক্কলনকারীগণের ধারণানুযায়ী এই প্রবণতা ২০২০ সাল পর্যন্ত স্থিতিশীলভাবে প্রবল থাকবে কারণ লোকজন অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে এবং ডেভলপার এবং রেসিডেন্টদের নিকট বিক্রয়যোগ্য জমি সুলভ হয়ে উঠছে। ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধির অর্থ হলো অধিক ক্রয়ক্ষমতা। এছাড়া, ব্যক্তিগত ব্যবহার বা বাণিজ্যিক সম্ভাবনার নিরিখে রিয়েল এস্টেট সাধারণত ভোক্তার ক্রয়তালিকার শীর্ষে থাকে। জনগণের বর্ধিত সম্পদ, বিশেষ করে আগামী পাঁচ বছরের জন্য, বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট বাজারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উচ্চ আশাবাদ জাগায়।

প্রবণতা# ৬: সরকার পরিবর্তন। ২০১৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট বাজারে ভাঁটা পড়ার প্রধান কারণ ছিল সরকারী হস্তক্ষেপ এবং আমলাতন্ত্র। কিন্তু সুবিজ্ঞ বিনিয়োগকারীগণ অনুমান করছেন যে, বৈদেশিক মালিকানা আইনে পরির্তন সাধন করলে সামনের বছরগুলোতে অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। বৈদেশিক বিনিয়োগ যেহেতু পরিবর্তনের একটি প্রধান চালিকাশক্তি তাই বাংলাদেশ সরকার ব্যবসা পরিচালনা, অনুদান অনুমোদন, চুক্তি প্রক্রিয়াকরণ এবং সাধারণ কর্মপ্রণালী সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হবে। এসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশন্স (Association of Southeast Asian Nations) এর মত সংস্থা গঠিত হয়েছে যাদের অন্যতম লক্ষ্য হলো বৈদেশিক বিনিয়োগ। যে সকল দেশে সরকারী কার্যপ্রণালীতে লালফিতার দৌরাত্ম, দূর্নীতি আর অপকৌশলের চর্চা হয় এমনসব সরকারের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করতে তারা আগ্রহী হবে না।

Comments

comments