সফলতার শীর্ষে অ্যাপেলের বিতর্কিত ম্যাকবুক প্রো

আপনি যদি সাম্প্রতিক তথ্য-প্রযুক্তি সংক্রান্ত খবর পড়ে থাকেন তবে আপনি হয়ত অ্যাপেলের ম্যাকবুক প্রো লাইনের ল্যাপটপগুলোর সম্পর্কে অনেক সন্দেহ মূলক এবং এমনকি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুনে থাকবেন। মাইক্রোসফট তাদের অসাধারণ সারফেস স্টুডিও উন্মোচন করার পর পরই ম্যাকবুক প্রো তাদের ইভেন্ট আয়োজন করে। একদিকে অ্যাপেলকে নিয়ে বাজারে যখন সমালোচনার ঝড় তখন অন্যদিকে মাইক্রোসফট সারফেস স্টুডিও ইতমধ্যেই বাজারে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাপী তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা অ্যাপেলের ম্যাকবুক প্রোর সামগ্রিক প্যাকেজ নিয়ে যখন অসন্তোষ প্রকাশ করে চলেছেন তখন স্লাইস ইন্টেলিজেন্সের মতে অ্যাপেলের ম্যাকবুক প্রো ২০১৬ সালে আমেরিকায় অন্যান্য ল্যাপটপ কোম্পানির তুলনায় মাত্র পাঁচ দিনে সবচেয়ে বেশি আয় করার রেকর্ড গড়েছে।

বিষয়টির বিস্তারিত আলোচনা শুরু করার আগে অ্যাপেলের ম্যাকবুক প্রো সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক। অ্যাপেল ম্যাকবুক প্রো-এর তিনটি সংস্করণ বের করেছে, একটি ১৩ ইঞ্চির মডেল, একটি টাচ বার সহ ১৩ ইঞ্চির মডেল এবং একটি টাচ বার সহ ১৫ ইঞ্চির মডেল। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে ‘টাচ বার’ কি? এটিই মূলত লাইন আপের প্রধান নতুন ফিচার। এক কথায় বলতে গেলে, এটি একটি পাতলা ও.এল.ই.ডি টাচস্ক্রীন যা কী-বোর্ডের ফাংশন কী গুলোর পরিবর্তে সংযোজন করা হয়েছে। এই টাচস্ক্রীনটি বর্ণনা প্রাসঙ্গিক এবং আপনি কি অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করছেন তার উপর এর ফাংশন নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ: আপনি যদি কোন চ্যাটের অ্যাপে যান তবে টাচ বারে আপনি ইমোজিগুলোকে দেখতে পাবেন। এতে একটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানারও সংযুক্ত করা আছে।

macbook-pro-oled-render

অ্যাপেল তাদের আগের ল্যাপটপগুলোতে ইউএসবি সি পোর্টের সুবিধার জন্য যেমন পোর্ট রেখেছিলো, নতুন ল্যাপটপে তারা তেমন ধরণের কোন পোর্ট তারা রাখেনি। টাচ বার ছাড়া ১৩ ইঞ্চির মডেলটিতে আছে দুটি পোর্ট, যেখানে অন্য দুটো মডেলে পোর্ট আছে চারটি করে। বহুবিধ অ্যাডাপ্টারের (সকল অ্যাডাপ্টার পৃথকভাবে বিক্রীত) সমন্বয় সাধনকে সম্ভব করে তৈরি এই পোর্টগুলো যদি ব্যবহার করতে চান তবে আপনি নতুন ল্যাপটপের সাথে যেকোন ধরণের বাহ্যিক হার্ডওয়্যারের সংযোগ স্থাপন করতে পারবেন। আইফোন বা আইপ্যাড সংযুক্ত করতে চাইলেও কিন্তু আপনাকে অ্যাডাপ্টার কিনতে হবে কেননা তাদের কোন ইউ.এস.বি সি পোর্ট বা ক্যাবল নেই। অ্যাপেলের চমৎকার মেগাসেইফ চার্জিং সুবিধাটি আর নেই – আপনি চার্জ দেয়ার জন্য যেকোন ইউ.এস.বি সি পোর্ট ব্যবহার করতে পারেন কিন্তু কেউ আপনার চার্জিং ক্যাবলের উপর হোঁচট খায় তবে গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে যদি।

3

ল্যাপটপটি ২০১৫ সালের সংস্করণের তুলনায় দৈর্ঘ্যে ৩ শতাংশ ছোট, প্রস্থে ৩ শতাংশ, ১৭ শতাংশ পাতলা এবং ওজনে ১৩ শতাংশ হালকা। এই ল্যাপটপে আরও থাকছে ২০১৫ সালের সংস্করণের তুলনায় ২৫ শতাংশ অধিক কালার রেঞ্জ এবং ৬৭ শতাংশ অধিক কন্ট্রাস্ট সম্বলিত ২৫৬০ x ১৬০০ পিক্সেল ডিসপ্লে। ট্র্যাক প্যাডটি ফোর্স টাচের। কী-বোর্ডটিতে ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের ম্যাকবুকের শ্যালো কী ব্যবহার করা হয়েছে। টাচ বার ছাড়া বেইসলাইন মডেলটির প্রারম্ভিক মূল্য ১,৪৯৯ ডলার থেকে যা কিনা ২০১৫ ম্যাকবুক প্রো-এর প্রারম্ভিক মূল্যের চেয়ে ২০০ ডলার বেশি।

1

এই নতুন ল্যাপটপটিকে ঘিরে এত সমালোচনা এসেছে বিভিন্ন আঙ্গিকে এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। যেসব উল্লেখযোগ্য কারণগুলো অ্যাপেলের ভক্তদের বিক্ষুদ্ধ করেছে সেগুলো হল: এসডি কার্ডের স্লট সরিয়ে ফেলা, মেগাসেইফ চার্জিং সুবিধাটি না রাখা, এনভিডিয়ার নতুন ১০ সংস্করণের প্যাস্কেল নির্ভর জিপিইউ না রাখা, সর্বোচ্চ মাত্র ১৬ জিবি র‍্যামের সুবিধা রাখা এবং পুরনো জেনারেশনের ইন্টেল স্কাইলেক প্রসেসর ব্যবহার করা। এছাড়াও, সমালোচকরা অ্যাপেলের ইকোসিস্টেমের কনভলুটেড স্টেট যা কিনা পূর্বে ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুবিধাজনক হওয়ার কারণে অনেক জনপ্রিয় ছিল তা নিয়েও বেশ সমালোচনা করেছে। বর্তমানে আপনি যা কিছুই ল্যাপটপের সাথে সংযুক্ত করতে চান আগের ২০১৫ (এবং এমনকি ২০১৬) সালের মডেলের ল্যাপটপ থেকে সব কিছুর জন্যই আপনাকে নতুন অ্যাডাপ্টার কিনতে হবে যা আপনার অতিরিক্ত খরচ বাড়াবে এবং কাজের ক্ষেত্রেও ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। শুধু তাই-ই নয় এই পোর্টগুলো মোটেও সুবিধাজনক নয় এবং পোর্টগুলো থেকে অ্যাডাপ্টার সহজেই খুলে যায়। আইফোন এবং আইপ্যাডের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের সুবিধাটি না রাখা একেবারেই অযৌক্তিক এবং একই সাথে টাচ বারের ধারণাটিও সমালোচকদের যৌক্তিক মনে হয়নি। পরিশেষে, মূল্যের স্কীম ছিল সমালোচনার শীর্ষে।

2

স্লাইস ইন্টেলিজেন্স তাদের রিপোর্টে প্রকাশ করেছে যে, ৪০% ২০১৪ সালের ম্যাকবুক ব্যবহারকারীরা উইন্ডোজ ইকোসিস্টেমে সুইচ করেছে – বিশেষ করে ডেল কোম্পানির ল্যাপটপে। তবে হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত অ্যাপেল অন্য যে কোন ল্যাপটপ কোম্পানির চেয়ে ২০১৬ সালে মাত্র পাঁচ দিনে সর্বাধিক আয় করেছে। এটি কিভাবে সম্ভব হল? অনুমান করা হচ্ছে যে বেশিরভাগ বিক্রয় সংঘটিত হয়েছে ম্যাকবুক প্রো বাজারে ছাড়ার প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে। মিডিয়াতে অগণিত নেতিবাচক রিভিউ আসার আগেই বেশুমার বিক্রি হতে থাকে ম্যাকবুক প্রো। তাছাড়াও, স্লাইস ইন্টেলিজেন্স কিন্তু শুধু মাত্র অ্যাপেলের আয়ের ব্যাপারেই রিপোর্ট করেছে, ঠিক কি পরিমাণ ল্যাপটপ বিক্রয় করা হয়েছে সে সম্পর্কে কিছু বলেনি। এর অর্থ হল যদি অ্যাপেল অন্য কোম্পানিগুলোর তুলনায় সংখ্যায় কম ল্যাপটপ বিক্রয় করে থাকে তারপরও তারা তাদের চড়া মূল্য দিয়ে সহজেই বেশি আয় করতে পারবে।

7

প্রকৃত বিক্রয়ের সংখ্যা যতক্ষণ না প্রকাশিত হচ্ছে (যদিও এই সংখ্যা প্রকাশিত হবার সম্ভাবনা একেবারেই নেই) ততক্ষণ পর্যন্ত অ্যাপেলের নতুন ল্যাপটপ সম্পর্কে মানুষের প্রতিক্রিয়াকে কোন ধরণের পরিমাপে ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। যদিও অ্যাপেলের এই নতুন সংস্করণটি অত্যন্ত সুনিপুণ, তবে বেশিরভাগ রিভিউয়ারের মতে এটি ‘প্রো’ টাইটেল পাবার যোগ্য নয়। এমনকি সন্তুষ্ট ব্যবহারকারীরাও যে সব রিভিউ দিয়েছেন তারাও একই কথা বলেছেন – নতুন ম্যাকবুক প্রো সত্যিই অসাধারণ যদি আপনি সংস্করণটিকে ম্যাকবুক এয়ার হিসেবে চিন্তা করেন। যদি সত্যিকার অর্থেই প্রোফেশনালদেরকে উদ্দেশ্য করে ল্যাপটপটি বানানো হয়ে থাকে তবে বলা চলে ল্যাপটপটি সে ধরণের ক্রেতাদের উপর কোন ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে না। অ্যাপেলের কোন পণ্যের ‘প্রো’ নামের সংস্করণের এটিই প্রথম সমালোচনা নয় (আইপ্যাড প্রো-এর কথা মনে করুন) এবং মনে হয় না এটিই হবে শেষ সমালোচনা, অর্থাৎ পণ্যের নামের সাথে ফিচারের অসামাঞ্জস্যতা হয়ত ভবিষ্যতে আরও দেখা যেতে পারে। মিডিয়া যত যাই বলুক অ্যাপেল তাদের নতুন পণ্যটি নিয়ে অনেক আশাবাদি এবং মনে হচ্ছে তাদের ক্রেতারা এই বিতর্কিত নতুন পণ্যটির নানাবিধ নেতিবাচক দিক গুলো নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাবে না।

 

Comments

comments